সুরঞ্জন দাস ( চিত্র পরিচালক )
আমার মনে হয়েছে আমি ছবি করার চেষ্টা করি ওটা করতে ভালো লাগে বলে। সবার মতো আমারও তো একটি ভাষার প্রয়োজন। বাড়তি অর্থহীন কথার বদলে সহজ প্রকাশ- এই তো মোদ্দা কথা।
আমি বরাবরই ইন্সপায়ারড। প্রথম সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখি ‘আগন্তুক’। তারপর প্রেমে পড়েছিলাম ভদ্রলোকের নির্মাণের। যেমন অনেকের মতেই ঋত্বিক সত্যজিতের চেয়ে ভালো। আমার মতে এ তুলনা অর্থহীন। কারণ আমার ঋত্বিকের ছবি দেখলে ভয় করে। ভীষণ বিপজ্জনক শিল্প। এত বেশি সত্য, এত বেশি চাবুকের দাগ আমার সয় না। আমি ব্যক্তিগত জীবনে ওই যন্ত্রণা উপভোগ করিনি। আমি কম্যুনিস্ট নই। আমি মনেই করি না কম্যুনিস্ট হওয়ার কোনো যোগ্যতা আমার আছে বলে। অত পবিত্র কর্তব্য সাধন করতে আমি চরাচরে আসিনি।
সত্যজিতের পরে আমাকে যার ছবি সবচেয়ে বেশি বসিয়ে রাখতে পেরেছে তার নাম তরুণ মজুমদার। আমি হাঁ করে ওঁর ছবিগুলো গিলেছি। অন্তরঙ্গ বামমনস্কতা এবং তার সাথে আদ্যন্ত পজিটিভ রোম্যান্টিসিজমের মেলবন্ধন যদি বাংলায় কেউ করে দেখাতে পারেন তার নাম তরুণ মজুমদার। কিন্তু তার মানে কিন্তু এই নয় আমি এই ইন্সপিরেশনটা সিনেমায় ফেলতে পেরেছি। আমার ছবি ‘অপার্থিব’-এ কোথাও তরুণ মজুমদার বা সত্যজিৎ রায় নেই। ওখানে আমিই আছি। আমার কল্পনার ঘোড়ায় চড়ে শহরছাড়ার বাসনা পুঞ্জিভূত হয়ে ঢুকে আছে অপার্থিবের প্রত্যেকটা ফ্রেমে। মেকিং – এ আমি সৎভাবে প্রভাবমুক্ত। আমার বিশ্বাস আমি যা দেখিয়েছি তা আমি গল্প থেকে দেখেছি, এবং মানসপটে ভাসা এক টুকরো ঘটনার সাথেও আমার ছবির কোথাও কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। হুবহু যা ভেবেছি তা তো কখনো হয় না, কিছু পার্থক্য থাকেই। সেটুকুই আছে।
বাণিজ্যিক ছবি কী হলে কী হতে পারত আমি জানি। অনেকের থেকে ভালো বানাতেও পারতাম সুযোগ পেলে। তারানাথ বাণিজ্যিক ছবির সব উপাংশ নিয়ে তৈরি, আমি নিশ্চিত আরেকটু ভালো সেট আপ পেলে আর সামান্য বেশি অর্থ পেলে আরও দুর্দান্ত হতে পারত। এ ছবি যতটা মন কেড়েছে দর্শকের, আমি তার চেয়ে কমই আশা করেছিলাম। আর প্রতিকূলতার কথা বললে সে তো আরেক ইতিহাস।
ছবি এই মুহুর্তে কমিউনিকেশন হিসেবে ততটা শক্তিশালী নেই। বিকল্প মাধ্যম এসে গেছে পৃথিবীতে, তাই ছবি নিয়ে, বিশেষত কন্টেন্ট নিয়ে এবং খুব বাধ্যতামূলকভাবে ফর্ম নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। এক্সটিংশানকে রুখতে হলে একেবারে অন্য ভাষায় গল্প বলতে হবে। আমার ধারণা এই যুগ ভাষা আবিষ্কারের যুগ। এ কাজ এক্ষুনি না করলেই নয়। আমাদের মতন যারা সিনেমার ছাত্র, তাদের খুব প্রয়োজন। আমার মতন মধ্যমেধার ছবিওয়ালারা এ কাজে অগ্রণী নাও হতে পারে। অবশ্য মধ্যমেধা বলে আমি নিজেকে হয়ত ছোটোই করছি। যে স্তরে অখাদ্য ছবি তৈরি হচ্ছে আজকাল( সবাই নয় )!
তবু একটা কথা বলব সিনেমা সিনেমাই। এর বিকল্প আমি এখনও কিছু দেখছি না, দেখি না। এর শক্তি কমেছে, গুরুত্ব নয়। সিনেমা থেকে ওয়েব থেকে মাইক্রো ফিল্মের বিবর্তন অনুসরণযোগ্য, গুরুত্বহীন নয়। চোখের সামনে দেখছি প্রতিবেশী দেশ অসামান্য হয়ে উঠছে তাদের চিত্রনাট্য, অভিনয়ে। কাজেই গল্প বলা একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ। দিনের শেষে ওইটেই শেষ কথা বলে। সেদিকে লক্ষ্য রাখার জন্য কিন্তু এরকম অসংখ্য দুর্দান্ত সাহিত্য রয়েছে। মৌলিক গল্পের দিকে না ঝুঁকে যদি এইদিকটায় একটু দৃষ্টিপাত করা যেত!
- সুরঞ্জন দাস ( চিত্র পরিচালক )
