সম্পাদকীয়ঃ রোয়াক পার্বণী সংখ্যা, ১৪৩৩
যেখানে সব ট্রেন দাঁড়ায়
উৎসবের একটা নিজস্ব সময় থাকে। সেই সময় ক্যালেন্ডারের পাতায় বাঁধা, আবার বাঁধা নয়ও। শারদীয়ার আগমনে যেমন ফিরে আসে ছেলেবেলার উঠোন, পাড়ার রক, পুরোনো বাড়ির ঠাকুরদালান, তেমনই ফিরে আসে কিছু প্রশ্ন। কোথায় গেল সেই আড্ডা? কোথায় হারিয়ে গেল তর্কের অবকাশ? যে সমাজ একদিন কবিতা, রাজনীতি, সিনেমা, নাটক, ফুটবল, প্রেম এবং বিপ্লব নিয়ে রাত জাগতে পারত, সে আজ এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায় কী করে? ভিন্নমতকে শত্রু বলে চিনতে শিখল কখন? আর সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—যে সময়ে চারপাশের এত কিছু বদলে যাচ্ছে, সেই সময়কে আমরা কতটা বুঝতে পারছি? রোয়াকের পার্বণী সংখ্যা এই প্রশ্নগুলির সামনে দাঁড়িয়েই পঞ্চম বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রবেশ করছে। পাঁচ বছরের এই যাত্রাকে নিছক কোনও ওয়েবজিনের প্রকাশনা-ইতিহাস বলে আমরা দেখতে চাই না।
এই সংখ্যার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ কানন বালা দেবীর অভিনয়জীবনের শতবর্ষ। বাংলা অভিনয় ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কানন দেবীর উপস্থিতি এমন এক অধ্যায়, যাকে কেবল জনপ্রিয়তার নিরিখে বিচার করলে তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য ধরা পড়ে না। তিনি ছিলেন এমন এক সময়ের শিল্পী, যখন বাংলা ভাষার আধুনিক গণসংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে; নির্বাক চলচ্চিত্র থেকে সবাক চলচ্চিত্রে উত্তরণ ঘটছে; রেকর্ড, গ্রামোফোন, মঞ্চ ও পর্দা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নাগরিক বিনোদনের জগৎ। সেই জগতে একজন নারীর শিল্পী হয়ে ওঠা, নিজের কণ্ঠ ও উপস্থিতির মাধ্যমে বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছনো, একই সঙ্গে পেশাদারিত্ব ও স্বাতন্ত্র্য অর্জন করা—এসবই ছিল সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এই সংখ্যার আর এক গুরুত্বপূর্ণ স্মরণ অন্নপূর্ণা দেবীর শতবর্ষ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে অন্নপূর্ণা দেবীর নাম উচ্চারণ করলেই এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সামনে আসে। তাঁর সংগীতসাধনা নিয়ে কিংবদন্তির অন্ত নেই, অথচ জনসমক্ষে তাঁর পরিবেশনা ছিল অত্যন্ত সীমিত। সুরের জগতে অসামান্য সাধনার অধিকারী হয়েও তিনি দীর্ঘকাল জনপরিসরের প্রচলিত তারকাখ্যাতির বাইরে থেকেছেন।
উস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কন্যা এবং মাইহার ঘরানার এক অসামান্য সুরসাধক হিসেবে অন্নপূর্ণা দেবীর জীবনকে বোঝার জন্য আমাদের সংগীতের ইতিহাসের পাশাপাশি সংগীতকে ঘিরে তৈরি হওয়া সামাজিক কাঠামোর দিকেও তাকাতে হয়। গুরু-শিষ্য পরম্পরা, সাধনার ব্যক্তিগত পরিসর, উত্তরাধিকার, শিল্পীর আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জনসমক্ষে শিল্পকে উপস্থাপনের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়।
পাশাপাশি, আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নাম এবং কাজের শতবর্ষ এই ইংরেজির ২০২৬ সাল। যেমন ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের ১০০ বছর; এক শতাব্দী পরেও পথের দাবী আমাদের কাছে এমন একটি সাহিত্যকর্ম, যার রাজনৈতিক প্রশ্নগুলি নতুন করে পড়ার দাবি রাখে। আজকের ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে উপন্যাসটি পড়ার সময় তাই সরল ঐতিহাসিক সমান্তরাল টেনে দেওয়া যথেষ্ট নয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও বর্তমানের নির্বাচিত সরকারকে একই রাজনৈতিক কাঠামো বলে ঘোষণা করা ইতিহাসের প্রতি অবিচার হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা কীভাবে নাগরিকের স্বাধীনতার সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, ভিন্নমতকে কীভাবে সন্দেহের চোখে দেখে, রাজনৈতিক আনুগত্যকে কীভাবে নাগরিকত্বের পরীক্ষায় পরিণত করে—এই প্রশ্নগুলি আজও প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রের সমালোচনা কি রাষ্ট্রবিরোধিতা? সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কি দেশের বিরোধিতা? কোনও নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ কি কেবল বিশৃঙ্খলা, নাকি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ভাষা? প্রশ্নগুলিকে যদি আমরা প্রশ্ন হিসেবেই রাখতে না পারি, তবে স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল জাতীয় গৌরবের উৎসব হয়ে থাকবে, তার অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক শিক্ষা হারিয়ে যাবে।
রাজশেখর বসুর শতবর্ষ পেরিয়ে আরও কয়েক বছর। তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার স্মরণ করার অর্থ কেবল পরশুরামের গল্পের হাস্যরস উপভোগ করা নয়। বাংলা গদ্য, অনুবাদ, পরিভাষা নির্মাণ, বিজ্ঞানচর্চা এবং ব্যঙ্গসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান আমাদের নতুন করে বিচার করা দরকার।
যে সমাজ নিজের উপর হাসতে ভুলে যায়, সে সমাজ ক্রমশ ক্ষমতার হাস্যকর রূপগুলিকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শেখে। আর যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেখানে যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় আনুগত্য।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পালাবদল একটি পরিচিত শব্দ। নির্বাচনের ফল বদলায়, শাসকের মুখ বদলায়, স্লোগান বদলায়, ক্ষমতার কেন্দ্রের আশপাশে নতুন মানুষ জমায়েত হয়। কিন্তু পালাবদলের সঙ্গে কি প্রশাসনিক সংস্কৃতিরও বদল ঘটে? নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক বদলায়? নাকি রাজনৈতিক ভাষ্যের ভিতরে নতুন মুখোশ পরে পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোই ফিরে আসে?
সরকারের বৈধতা নির্বাচনী ম্যান্ডেট থেকে আসে, কিন্তু গণতান্ত্রিক বৈধতা বজায় রাখতে হলে সরকারকে নিয়মিত জনজবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। নির্বাচনে জয়লাভ কোনও স্থায়ী নৈতিক ছাড়পত্র নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন মানেই প্রতিটি নীতি ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না; বিরোধীদের দুর্বলতা মানেই শাসকের সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে না। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ও চলমান রাজনৈতিক সংকটগুলিকে বিচার করতে গেলে এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি। নির্বাচন, নিয়োগ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন প্রমাণ, নথি, স্বাধীন অনুসন্ধান ও জবাবদিহি। রাজনৈতিক প্রচার যেমন বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প নয়, তেমনই সরকারি বিবৃতিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। প্রশ্নটি শুধু কতগুলি নাম বাদ পড়ল বা কতগুলি নাম যুক্ত হল, তা নয়। প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ, আপত্তি জানানোর সুযোগ কতটা কার্যকর, সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা সহজ এবং প্রশাসনিক ভুল সংশোধনের দায় কার—এসবও বিচার্য। ভোটাধিকার গণতন্ত্রের প্রবেশদ্বার। সেই দরজায় পাহারা বসানোর আগে নিশ্চিত করতে হবে, বৈধ নাগরিকের প্রবেশাধিকার যেন প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে না যায়। ভোটার তালিকার শুদ্ধতা এবং সর্বজনীন ভোটাধিকারের সুরক্ষা পরস্পরের বিরোধী নয়; সঠিক প্রশাসনের কাজ হল দুটিকেই নিশ্চিত করা।
শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ বিতর্ক কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিবরণ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর সময়, শ্রম, আর্থিক বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন। একজন চাকরিপ্রার্থী বছরের পর বছর পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। পরিবার নিজেদের সঞ্চয় খরচ করে। কেউ টিউশনি করে, কেউ অস্থায়ী কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালায়, কেউ অন্য শহরে গিয়ে কোচিং নেয়। এই পরিশ্রমের বিনিময়ে সে প্রত্যাশা করে একটি স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া—যেখানে মেধা, যোগ্যতা এবং নির্ধারিত নিয়মই হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
সেই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি, অনিয়ম বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সামনে এলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু কয়েকজন প্রার্থী নন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা ব্যবস্থার প্রতি সামাজিক আস্থা। যাঁরা যোগ্যতা অর্জন করেও সুযোগ পাননি, তাঁদের কাছে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে উঠতে পারে। যাঁরা চাকরি পেয়েছেন, তাঁদেরও অন্যায়ের অভিযোগের মধ্যে নিজেদের পেশাগত মর্যাদা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। আর বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা প্রত্যক্ষ করে, যে ব্যবস্থা তাদের ন্যায় ও যোগ্যতার শিক্ষা দেয়, সেই ব্যবস্থাই নিজের নিয়ম ভাঙতে পারে। এই ক্ষতি অর্থ দিয়ে মাপা যায় না।
তরুণ-তরুণীদের রাগকে আমরা প্রায়ই অপরিণত আবেগ বলে ব্যাখ্যা করতে চাই। আন্দোলন করলে বলি, তারা রাজনীতি করছে; প্রশ্ন তুললে বলি, তারা প্ররোচিত; প্রতিবাদ করলে বলি, তারা বাস্তবতা বোঝে না। অথচ কোনও সমাজে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠলে সেটিকে কেবল শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। যে প্রজন্ম শিক্ষার জন্য সময় ব্যয় করেছে, প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে, পরিবারের প্রত্যাশা ও আর্থিক চাপ বহন করেছে, সে যদি দেখে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, যোগ্যতার মূল্য প্রশ্নবিদ্ধ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা অধরা, তবে তার ক্ষোভের সামাজিক ভিত্তি রয়েছে।
শাসক যদি প্রতিটি সমালোচনার উত্তরে আত্মরক্ষার প্রাচীর তোলে, তবে প্রশাসন ও নাগরিকের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। যদি প্রতিটি প্রশ্নকে ষড়যন্ত্র বলে চিহ্নিত করা হয়, তবে রাষ্ট্র নিজের সংশোধনের সুযোগ হারায়। আর যদি নাগরিকের ক্ষোভের কোনও গ্রহণযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক পথ না থাকে, তবে সেই ক্ষোভ আরও গভীর হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিতে পারে।
প্রতিরোধ গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু প্রতিরোধের রাজনীতি তখনই দীর্ঘস্থায়ী অর্থ পায়, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় সংগঠন, নীতি, যুক্তি, আত্মসমালোচনা এবং বিকল্প নির্মাণের ক্ষমতা।
গণতন্ত্রের সংকট সব সময় নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। গণতন্ত্রকে যদি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হিসেবে দেখি, তবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বাদ পড়ে যায়। গণতন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংখ্যালঘুর অধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকার গঠনের অধিকার দেয়; কিন্তু নাগরিকের সমস্ত অধিকার নিয়ন্ত্রণের অবাধ অনুমতি দেয় না।
সভ্যতার প্রশ্নটিও এখানেই। কোনও সমাজ কতগুলি উঁচু বাড়ি তৈরি করেছে, কত দ্রুত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, কত বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে—এসব তার অগ্রগতির একমাত্র মাপকাঠি নয়। সমাজ কতটা ভিন্নমত সহ্য করতে পারে, দুর্বল মানুষের অধিকার কতটা রক্ষা করে, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে কি না, জ্ঞান ও যুক্তিকে কতটা সম্মান করে—এসব দিয়েও সভ্যতার মান নির্ধারিত হয়। এই প্রসঙ্গে ভারতের আন্তর্জাতিক সূচকগুলিতে অবস্থান নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, সেটিকেও তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করা দরকার। গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানবোন্নয়ন, ক্ষুধা, লিঙ্গসমতা কিংবা দুর্নীতি—প্রতিটি সূচকের নিজস্ব পদ্ধতি, সীমাবদ্ধতা এবং পরিমাপের মানদণ্ড রয়েছে। সব সূচক একই বিষয় মাপে না; কোনও একটি র্যাঙ্কিংকে দেশের সামগ্রিক বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি ভাবাও ঠিক নয়। কিন্তু বিভিন্ন সূচকে ধারাবাহিক দুর্বলতা দেখা গেলে সেগুলিকে নিছক বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে প্রশ্ন করা উচিত, কোন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাগুলি এই মূল্যায়নের পিছনে রয়েছে।
বন থেকে জঙ্গল, নদী থেকে সমুদ্র, পাহাড় থেকে খনিজ—প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে আমাদের সময়ের সংঘাত ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। উন্নয়নের নামে প্রকৃতির উপর মানুষের অধিকারকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, যেন নদী কেবল জলসম্পদ, বন কেবল কাঠ বা খনিজের ভাণ্ডার, সমুদ্র কেবল বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র এবং পাহাড় কেবল উত্তোলনযোগ্য সম্পদের স্তূপ। একটি বন ধ্বংস হলে শুধু গাছ হারিয়ে যায় না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আদিবাসী ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় জ্ঞান, জলচক্র এবং একটি সমগ্র বাস্তুতন্ত্র। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বড় পরিবর্তন ঘটলে তার প্রভাব পড়ে কৃষি, মৎস্যজীবী, পানীয় জল, নদীতীরবর্তী বসতি এবং স্থানীয় অর্থনীতির উপর। উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্প, বন্দর বা অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হলে কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর সম্ভাবনার পাশাপাশি জীবিকা, ভূমির অধিকার এবং পরিবেশগত ঝুঁকির হিসাবও জরুরি।
প্রকৃতি কোনও অনন্ত ভাণ্ডার নয়। তাকে কেবল বাজারের পণ্য হিসেবে দেখলে আমরা ভুলে যাই, অর্থনীতির অস্তিত্বও প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। নদী, বন, মাটি, বাতাস ও সমুদ্রের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীর, জীবিকা ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে।
প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক তাই কোনও রোমান্টিক পরিবেশবাদীর একান্ত উদ্বেগ নয়। এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। লাভ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় অথচ পরিবেশগত ক্ষতি বহন করতে হয় স্থানীয় মানুষকে, তবে সেই উন্নয়নের ন্যায্যতা পরীক্ষা করা দরকার। যদি কোনও প্রকল্পের সিদ্ধান্তে প্রভাবিত জনগোষ্ঠীর মতামতকে উপেক্ষা করা হয়, তবে সম্মতি ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন ওঠে। যদি পরিবেশগত ছাড়পত্র, ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হয়, তবে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবের সঙ্গে কতটা মেলে, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হয়, সেখানে প্রথম আঘাতটি পড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-সংস্কৃতির পরিসর এবং স্বাধীন বৌদ্ধিক চর্চার উপর। কারণ এই পরিসরগুলি মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না; তারা প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করতে শেখায়, বিকল্প কল্পনা তৈরি করে এবং ক্ষমতার স্বাভাবিক বলে মনে হওয়া কাঠামোগুলিকে প্রশ্ন করতে শেখায়। কট্টরপন্থার অন্যতম বিপদ এখানেই—সে শুধু নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, অন্য মতের অস্তিত্বকেও অস্বস্তিকর বলে মনে করতে পারে। ইতিহাসের বহুমাত্রিক পাঠকে একমাত্রিক আখ্যানের মধ্যে আটকে ফেলতে চায়। সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে সন্দেহ করে। শিল্পীর স্বাধীনতাকে আনুগত্যের পরীক্ষায় বসায়। শিক্ষাকে অনুসন্ধানের বদলে নির্দিষ্ট মতাদর্শের পুনরাবৃত্তিতে পরিণত করতে চায়।
অথচ বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, থিয়েটার, সিনেমা, পত্রিকা কিংবা ছোট্ট কোনও আড্ডাঘর—এই সবকিছুরই একটি মৌলিক সামাজিক কাজ রয়েছে। এগুলি এমন পরিসর তৈরি করে, যেখানে মানুষ নিজের বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে অন্যের অভিজ্ঞতা শুনতে পারে। যেখানে কোনও প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে না মিললেও প্রশ্নটি বেঁচে থাকতে পারে। যেখানে বিরোধিতা মানেই সম্পর্কচ্ছেদ নয়, মতের অমিল মানেই শত্রুতা নয়। একইভাবে মুক্ত পরিবেশ মানে নিয়মহীনতা নয়; বরং এমন নিয়ম, যা মতপ্রকাশের অধিকারকে রক্ষা করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে সীমাবদ্ধ রাখে।
রোয়াকের মতো একটি ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক উদ্যোগের কাছে এই প্রশ্নগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের শক্তি প্রতিষ্ঠানগত ক্ষমতায় নয়, বরং চিন্তার স্বাধীনতা ধরে রাখার প্রচেষ্টায়।
এই ভাঙাচোরা সময়ের মধ্যে রোয়াক তার নিজস্ব পরিসরটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। আমরা জানি, একটি ওয়েবজিন পৃথিবী বদলে দিতে পারে না। একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রের নীতি বদলে যায় না, একটি প্রবন্ধে দুর্নীতির অবসান হয় না, একটি চলচ্চিত্রে সমাজের সমস্ত অসংগতি মুছে যায় না। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা উদ্যোগের গুরুত্বকে উড়িয়ে দিতে পারে না।
সমাজের পরিবর্তন সব সময় বড় ঘোষণার ভিতর দিয়ে আসে না। কখনও তা আসে একটি প্রশ্নের মধ্য দিয়ে, কখনও কোনও বিস্মৃত শিল্পীর পুনরাবিষ্কারে, কখনও কোনও নাট্যকর্মীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে, কোনও বইয়ের নতুন পাঠে। কখনও একটি প্রজন্ম আর-একটি প্রজন্মের কথা শোনে, ইতিহাসের কোনও উপেক্ষিত অধ্যায় ফিরে আসে নতুন আলোয়। এই ছোট ছোট কাজগুলিই সাংস্কৃতিক স্মৃতি নির্মাণ করে।
স্মৃতি এখানে নিছক অতীতের সংগ্রহ নয়। কী মনে রাখা হবে, কাকে মনে রাখা হবে, কোন অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ হবে এবং কোন কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাবে—এসবের মধ্যেই রয়েছে ক্ষমতা ও রাজনীতির প্রশ্ন। মূলধারার আলো অনেক সময় কয়েকটি পরিচিত মুখের উপর কেন্দ্রীভূত থাকে। তার বাইরে অসংখ্য শিল্পী, নাট্যকর্মী, লেখক, সংগঠক, গবেষক এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোগী নীরবে কাজ করে যান। তাঁদের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ না হলে একটি সময়ের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা অসমাপ্ত থেকে যায়। রোয়াকের কাজের ভিতরে আমরা সেই নথিবদ্ধ করার প্রয়োজনটিকে গুরুত্ব দিতে চাই। ইতিহাসের বড় নামগুলিকে পুনরায় পড়া যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি তাঁদের পাশে থাকা ছোট নামগুলি, তাঁদের সহযোগী, তাঁদের সময়, তাঁদের সংগ্রাম এবং তাঁদের কাজের সামাজিক পরিসরকে চেনা।
দৃশ্যমানতার বর্তমান অর্থনীতিতে কোনও কাজকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রচার, প্রযুক্তি, দর্শকসংযোগ এবং ধারাবাহিকতার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হয়, দর্শকসংখ্যাই কোনও কাজের একমাত্র মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। যে সাক্ষাৎকার আজ অল্প মানুষ দেখছেন, সেটিই হয়তো কয়েক বছর পরে কোনও গবেষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উপাদান হয়ে উঠবে। যে শিল্পী আজ মূলধারার আলোয় নেই, তাঁর বক্তব্য ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
এই ভাবনা থেকেই রোয়াকের অডিও-ভিজুয়াল প্ল্যাটফর্ম আর্টপৌরের যাত্রা আমাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আর্টপৌরেকে আমরা কেবল একটি ভিডিও চ্যানেল হিসেবে দেখতে চাই না। এটি আমাদের কাছে একটি ডিজিটাল সাংস্কৃতিক গ্রন্থাগার, একটি চলমান দৃশ্য-শ্রাব্য আর্কাইভ, একটি ভার্চুয়াল সংগ্রহশালা—যেখানে কথোপকথন, সাক্ষাৎকার, নাট্যচর্চা, সাহিত্য, সংগীত, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা সময়ের দলিল হয়ে উঠতে পারে।
এই কাজের জন্য আপনাদের ভালোবাসা, উৎসাহ এবং বিশ্বাস আমাদের কাছে অমূল্য। রোয়াকের পার্বণী সংখ্যা থেকে আর্টপৌরের দৃশ্য-শ্রাব্য উদ্যোগ—যে কোনও পরিসরেই যখন আপনারা সময় দেন, মনোযোগ দেন, সমালোচনা করেন, অন্যের কাছে পৌঁছে দেন, তখন এই উদ্যোগের সামাজিক ভিত্তি আরও শক্ত হয়।
বাঙালির আড্ডা নিয়ে নস্টালজিয়ার শেষ নেই। কফি হাউস, কলেজ স্ট্রিট, পাড়ার রক, ছোট পত্রিকার দপ্তর, নাটকের মহড়াঘর—এইসব জায়গাকে আমরা প্রায়ই এক হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণযুগের প্রতীক করে তুলি। কিন্তু আড্ডার ইতিহাসকে শুধু স্মৃতির আবেগে দেখলে তার সামাজিক তাৎপর্যটি অধরা থেকে যায়। আড্ডা ছিল এবং এখনও হতে পারে জ্ঞান বিনিময়ের অনানুষ্ঠানিক পরিসর, রাজনৈতিক মত গঠনের জায়গা, সাংস্কৃতিক পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্র, প্রজন্মের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যম। সেখানে কেউ বক্তা, কেউ শ্রোতা, কেউ সংশয়ী, কেউ বিরোধী। কখনও আলোচনা ফলপ্রসূ হয়, কখনও তা অমীমাংসিত থাকে। কিন্তু এই অমীমাংসিত থাকার মধ্যেই আড্ডার একটি বিশেষ শক্তি রয়েছে।
আজকের ডিজিটাল পরিসরে কথোপকথনের গতি বেড়েছে, মানুষের কাছে পৌঁছনোর সম্ভাবনাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে মনোযোগের সময় কমে যাওয়া, তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়ার চাপ, মেরুকরণ, অ্যালগরিদমের তৈরি পছন্দের বৃত্ত এবং যাচাইহীন তথ্যের বিস্তার নতুন সমস্যার জন্ম দিয়েছে। অনেকে কথা বলছেন, কিন্তু শোনার সময় কমছে। মত প্রকাশ বাড়ছে, কিন্তু মত বদলানোর অবকাশ কমছে। যোগাযোগের মাধ্যম বিস্তৃত হচ্ছে, অথচ ভিন্নমতের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংলাপ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আড্ডার নতুন পরিসর তৈরি করা একটি সাংস্কৃতিক কাজ। সেই আড্ডা কেবল অতীতের পুনর্নির্মাণ হবে না; বরং বর্তমানের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে তৈরি হবে। মুদ্রিত পাতা, ডিজিটাল লেখা, অডিও, ভিডিও, সাক্ষাৎকার, চলচ্চিত্র, নাট্যচর্চা এবং পাঠকের প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে তৈরি হতে পারে এমন এক পরিসর, যেখানে মানুষের অভিজ্ঞতা একে অন্যের কাছে পৌঁছয়।
আড্ডা, তর্ক, প্রশ্ন: বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিসর কি আবার তৈরি করা যায়? রোয়াক সেই সম্ভাবনাটুকু বাঁচিয়ে রাখতে চায়।
আমাদের কোনও বৃহৎ ক্ষমতার দাবি নেই। আমরা জানি, আমাদের পরিসর সীমিত, আমাদের সামর্থ্য সীমিত, আমাদের ভুলের সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একটি কাজ সম্ভব—নিজেদের সময়কে যতটা পারি মনোযোগ দিয়ে দেখা, তার দলিল সংগ্রহ করা, শিল্প ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা, এবং সেই প্রশ্নগুলি অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। আমাদের যৌথ প্রচেষ্টার এটুকুই ভিত্তি।
আসল ‘মন কি বাত’: যেখানে সব ট্রেন দাঁড়ায়
এই সংখ্যার শেষে এসে আবার ফিরে যেতে চাই সেই আড্ডাঘরে, যার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম।
কল্পনা করুন একটি স্টেশন –সেখানে বিভিন্ন দিক থেকে ট্রেন আসছে। কোনও ট্রেন বহন করে ইতিহাস, কোনওটি সাহিত্য, কোনওটি রাজনীতি, কোনওটি সংগীত, কোনওটি নাটক, কোনওটি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কোনও ট্রেনে আছেন প্রবীণ শিল্পী, কোনওটিতে নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মী, কোনওটিতে গবেষক, কোনওটিতে ছাত্রছাত্রী, কোনওটিতে এমন মানুষ, যাঁদের নাম সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে না অথচ যাঁদের শ্রম ছাড়া সমাজের সাংস্কৃতিক জীবন এগোয় না। সেই স্টেশনে কোনও একটি ট্রেনের একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। কোনও একটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েই সবাইকে কথা বলতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। ট্রেন আসে, থামে। মানুষ নামে। মানুষ ওঠে। কেউ নিজের অভিজ্ঞতা শোনায়, কেউ শোনে অন্যের কথা, কেউ প্রশ্ন করে।আপত্তি তোলে ; কেউ আবার নতুন কোনও যাত্রার প্রস্তুতি নেয়।
সময় মানুষকে কেবল দর্শক, ক্রেতা কিংবা অনুসারীতে পরিণত করতে চায়, সেই সময়ে আমরা পাঠক, চিন্তক, শিল্পী এবং সক্রিয় নাগরিকের পরিসর বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আপনাদের ভালোবাসা, সমালোচনা, সহযোগিতা ও সাহস আমাদের সঙ্গে থাকুক। রোয়াকের মুদ্রিত ও ডিজিটাল পাতা থেকে আর্টপৌরের দৃশ্য-শ্রাব্য পরিসর—সবখানেই আমরা এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তুলতে চাই, যেখানে কোনও গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে পূজা করার বাধ্যবাধকতা নেই, কোনও ক্ষমতার চোখরাঙানিতে কণ্ঠস্বর থেমে যায় না, এবং কোনও প্রশ্নকে শুধু অস্বস্তিকর বলে নির্বাসনে পাঠানো হয় না।
এই পার্বণী সংখ্যা সেই চেষ্টারই আর একটি অধ্যায়।
শুভ শারদীয়া।
রোয়াক সম্পাদকমণ্ডলী
ডা.গৌরব রায়, দেবার্ঘ্য দাস।
