শিবরাম, মৃণাল ও ডুগ ডুগ – স্বস্তিক সরকার
‘অনেকদিন পরে গলির মোড়ের অশথতলা দিয়ে আসছি – ও হরি! এখানে নুড়িটাকে নিয়ে এসেছে যে! নুড়ির স্থূল অঙ্গটা গাছের গোড়ায় এমনভাবে পুঁতেছে যে ওপরের উদ্ধৃত গোলাকার নিটোল মসৃণ অংশ দেখে শিবলিঙ্গ বলে ওকে সন্দেহ হতে পারে। এই প্রয়োগ নৈপূণ্য যার তাকে বাহাদুরি দিতে হয়। নুড়িটার চারদিকে ফুল বেলপাতা আতপ চালের ছড়াছড়ি।’ (গল্প: দেবতার জন্ম)
কথায় বলে ঈশ্বর হলেন সৃষ্টিকর্তা। তিনি এই প্রকৃতি, জীব কুল এবং সর্বোপরি মানুষের সৃষ্টি করেছেন। আবার ঈশ্বর রুষ্ট হলে সে সমস্ত কিছু ধ্বংস করতে পারেন এক তুড়িতে। এই মূলভাব মানুষ আদি অনন্তকাল ধরে বয়ে চলেছে। তাতে বিশেষ সমস্যাও নেই। পাপ পুণ্য, স্বর্গ নরকের ডামাডোলে মানুষ ঈশ্বরকে খানিক ইমপ্রেস করে চলার চেষ্টাই করে নিরন্তর। এই ইমপ্রেস করার প্রত্যয়ের পেছনে ভক্তি ভাবের থেকেও বেশি যা আছে তা হল ভয়। মানুষ ঈশ্বরকে ভয় পায় তাই সমঝে চলে। এতে তেমন সমস্যা নেই, তবে সমস্যা যেখানে এসে উদয় হয় তা হল এই ভয় একটা সময়ের পর মানুষের বিশ্বাসের চোখে আঙুল ঢুকিয়ে তাকে অন্ধ করে দেয়। কাজেই অন্ধবিশ্বাসের জন্ম হয়। মানুষের মনের এই অন্ধবিশ্বাস আবার ব্যবহার করে কিছু সুবিধাবাদী। তারা ওঁত পেতে থাকে কখন মানুষ পাপ পুণ্য, স্বর্গ নরকের ঝামেলায় নাস্তানাবুদ হয়ে প্রবল অন্ধবিশ্বাসের কবলে পড়বে আর সেই সুযোগে সুবিধাবাদীরা তাদের ফয়দা তুলবে। এসব আমি আপনা আপনি জানতে পারিনি। এসব আমায় জানালেন শিবরাম চক্রবর্তী সেই কোন ছোটবেলায়। গল্পটি প্রায় সবারই জানা। তবে গল্পটি যে শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা তা হয়তো অনেকেই জানেন না। কারণ গল্পটি এমনই প্রচলিত এবং লোকমুখে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে তা প্রায় লোককথার পর্যায়ে চলে গেছে। গল্পটি হল একটি সাধারণ পাথরের ঈশ্বর হয়ে ওঠার গল্প। ২০১৪ সালে যখন আমির খান অভিনীত, রাজকুমার হিরানি পরিচালিত pk ছবিটি প্রথম দেখি, সেই সময়ও শিবরাম চক্রবর্তীর এই কাহিনীর কথা আমার মাথায় উঁকি দিয়েছিল। রাজকুমার হিরানি কি শিবরাম পড়েছেন? জানা নেই তবে এবছর মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘ডুগ ডুগ’ ছবির পরিচালক ঋত্বিক পারিক শিবরাম পড়েছেন শুনলে অবাক হব না। ডুগ ডুগ একদিকে একটি মোটর বাইকের ডুগডুগ শব্দ আবার অন্যদিকে ভক্তি ও ভয়ের দ্বন্দ্বের মাঝে অন্ধ বিশ্বাস আড়াল থেকে যেন এক অদৃশ্য ডুগডুগি বাজিয়ে চলে আর তার তালে তালে নেচে যায় মানুষ অবিরাম। ছবির নামে এই বাঁদর নাচের রেফারেন্স থেকেই ছবির স্যাটায়ার শুরু। হ্যাঁ ডুগ ডুগ ২০২৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি স্যাটায়ার ধর্মী চলচ্চিত্র। তবে এই ছবি তৈরি হয়েছে ২০১৯-২০ সালে। এরপর বহু চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়া সত্ত্বেও নানা কারণে ছবিটির মুক্তি আটকে ছিল। শেষে অনুরাগ কাশ্যপ এবং তার দলবলের আনুকূল্যে ছবিটি এবছর মুক্তি পায়। ১৯৮৮ সালে রাজস্থানে চটিলা গ্রামের কাছে ৬২ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর ঘটে যাওয়া একটি পথদুর্ঘটনা এবং সেই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জনমত এবং অন্ধবিশ্বাসের কিছু অলৌকিক কাণ্ডকারখানার সত্যি গল্পের উপর ভিত্তি করে এই ছবির মূল কাঠামো। ডুগ ডুগ এর গল্পটি খানিকটা এরকম – ঠাকুর সাহেব এক জনপ্রিয় মদ্যপ ব্যক্তি। যে তার রোজকার মদের আসর থেকে তার লুনা বাইকে চেপে বাড়ি ফেরার পথে জাতীয় সড়কে পথদুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। পুলিশ এসে লাশের সদগতি করে এবং বাইকটি স্থানীয় থানায় নিয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতি রাতে সেই বাইকটি থানা থেকে উধাও হয়ে গিয়ে দুর্ঘটনা স্থলে কোন এক অলৌকিক বলে পৌঁছে যায়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই অলৌকিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা চলে তবে তা বিফলে যায় এবং বাইকটি প্রতিবারই উধাও হয়ে গিয়ে সেই দুর্ঘটনা স্থলে পৌঁছে যায়। এই কাণ্ডকারখানার খবর সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শেষমেষ ঘোষিত হয় ঠাকুর সাহেবের আত্মা এই জাতীয় সড়কের যাত্রীদের রক্ষা করতে এসেছেন এবং তারই চিহ্ন হলো এই বাইকটি। যথারীতি সেই বাইক ওই দুর্ঘটনা স্থলে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং শুরু হয় পুজো আর্চা। বাইকটির চারিদিকে তখন ফুল বেলপাতা আতপ চালের ছড়াছড়ি।
ভক্তি ভয় অন্ধবিশ্বাসের এই গল্প আদি অনন্তকালের। আমি খানিক শিবরাম ভক্ত বলে হয়তো এই দুই গল্প অর্থাৎ ‘দেবতার জন্ম’ এবং ‘ডুগ ডুগ’ এর সংযোগগুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। অন্ধবিশ্বাসের এই গল্প চলে আসছে বহুযুগ ধরেই। ডুগ ডুগ এই বিশ্বাস অবিশ্বাসের গল্প বলেছে একেবারে মজার ছলে, ব্যঙ্গ করে। স্যাটায়ার ধর্মী বিষয়ে অনেক সময় হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে আইডিওলজিক্যাল কনট্রাডিকশন প্রকাশ পায়। বার্টল ব্রেশট যেমন অনেক সময় গুরুতর সামাজিক বা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অন্য একটি পরিচিত জঁরের প্যারোডি হিসেবে উপস্থাপন করতেন। ডুগ ডুগ সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসের সংযোগকে সফলভাবে ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে দেখতে সক্ষম হয়েছে। তবে ডুগ ডুগ ছবিতে ঋত্বিক পারিক শুধুমাত্র অন্ধবিশ্বাস, ঈশ্বর ভীতি বা কুসংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে আনেন নি। রাজস্থানের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ, তাদের জীবন-জীবিকা, শুষ্ক প্রান্তর, রুক্ষ কাঁটা ঝোপের দৃশ্যের মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন এক কঠিন সারভাইভাল উপখ্যান। এই কঠোর থেকে কঠোরতম বেঁচে থাকার মাঝেই হয়তো মানুষের এমন কিছু অবলম্বন দরকার হয় যাকে বিশ্বাস করে সে আরো পাঁচটা দিন বেঁচে থাকতে পারে। ডুগ ডুগ বারবার সেই গল্পও বলেছে। এ ছবি যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আসলে দারিদ্রতার ইশতেহার। এখানেই গল্পটা শিবরাম থেকে হস্তান্তর হয়ে মৃণাল সেনের কাছে এসে পৌঁছায়। ‘কোরাস’ (১৯৭৪) ছবির শুরুর দৃশ্যে স্বর্গে বসে রবি ঘোষের চরিত্রটি পাঁচালী গাইছেন –
“রাজা বলে জ্ঞানীগণ শোন মন দিয়া
কোথায় অভাব নাই বলো বুঝাইয়া।
পন্ডিতেরা বলে তারে সহজ উত্তর,
অভাব না থাকে যদি থাকে না ঈশ্বর।“ *******
‘কয়েক মাস বাদে যখন ফিরলাম তখন অশথতলার মোড়কে আর চেনাই যায় না। ছোটখাট একটা মন্দির উঠেছে, শঙ্খ ঘন্টার আর্তনাদে কান পাতা দায় এবং ভক্তের ভিড় ঠেলে চলা দুরূহ।’ (গল্প: দেবতার জন্ম)
ঋত্বিক পারিক ডুগ ডুগ ছবিটি শুরু করেন পানশালায় প্রচুর নিয়ন আলো জ্বলে ওঠার দৃশ্যের মাধ্যমে। ঠাকুর সাহেব মদ্যপান শেষ করে তার লুনা বাইকে চেপে জাতীয় সড়ক ধরে বাড়ি ফিরছেন। একটি দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালক এই দৃশ্যটি দেখিয়েছেন। এই গোটা দৃশ্যে কোনরকম আবহসংগীত এবং সংলাপ নেই। ঠাকুর সাহেব নেশাতুর অবস্থায় অন্তহীন সড়কে তার ছোট্ট বাইকে চেপে বৃহৎ বৃহৎ ট্রাক, লরি, বাসকে টক্কর দিচ্ছেন। নেশার ঘোরে টাল খেয়েও কাটিয়ে চলেছেন বৃহৎ সব বাধা। সিনেমা শুরুর খানিক পর থেকেই এই সংলাপহীন বাইক সফর দেখান পরিচালক। শুরুতেই ছবিটা বাকি হিন্দি ছবির থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই দীর্ঘ বাইক সফরের দৃশ্য যেন ঠাকুর সাহেবের দীর্ঘ জীবনযাত্রা। তিনি নেশাগ্রস্থ, কিন্তু নেশার ঘোরেও ওভারটেক করছেন তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী সব যানবাহন। টাল সামলে বাধা কাটিয়ে এগিয়ে চলেছেন খানিক অভ্যাসের বশেই। তারপর ঘটে দুর্ঘটনা। দীর্ঘ যাত্রার ইতি ঘটে। ঠাকুর সাহেবের মৃত্যু হয়। এ ছবির কোন মূল চরিত্র নেই। এই বিষয়টাও আর পাঁচটা ছবির থেকে এ ছবিকে আলাদা করে। একটা গোটা ছবি বয়ে নিয়ে চলে সমষ্টি বা বলা চলে ক্রাউড যা খানিকটা কালজয়ী চলচ্চিত্র ব্যাটলশিপ পোটেমকিনের কথা মনে করায়। সে এক অন্য আলোচনা। আমরা ফিরে আসি সেই অলৌকিক বাইক প্রসঙ্গে। সে বাইক জাতীয় সড়কের ধারে প্রতিষ্ঠা করা হলো ঈশ্বর হিসেবে। ইতিমধ্যে কিছু সাধু গোছের মানুষ তার আশেপাশে ঘোরাফেরা শুরু করলো। দেখতে দেখতে তৈরি হল মন্দির, জড় হলো কিছু সুবিধাবাদী। স্বাভাবিকভাবেই এলেন কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মন্দিরের চারপাশে বসলো মেলা আর এই মেলাতেই এলো এক বেলুনওয়ালা। সে একটি বৃহৎ বেলুন ফোলাতে শুরু করল। মন্দিরকে কেন্দ্র করে জাঁকজমক যত বাড়তে থাকলো সেই বেলুনওয়ালার গোলাপি বেলুনও ততই ফুলেফেঁপে উঠল। মন্দির ঘিরে তৈরি হল ট্রাস্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হওয়ার ফলক লাগানো হলো, জুটে গেল পুঁজিপতিরা এবং শুরু হল লাখ লাখ টাকার লেনদেন। বেলুন তো বিশাল আকৃতি ধারণ করল কিন্তু তার ভেতরটা রয়ে গেল ফাঁপা। এ ছবিতে এমনই কিছু মেটাফর দারুণভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। গোলাপি বেলুন, দুর্ঘটনাস্থলের সামনে দৃশ্যমান এক জাদুকরের ম্যাজিক শো এর হোল্ডিং এবং নির্দিষ্ট কিছু রং এর ব্যবহার ছবিটিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। গোটা ছবিতে গোলাপি এবং নীল রঙের ব্যবহার চোখে পড়ে যা ছবির স্বতন্ত্র থিম নির্ধারিত করে। ছবি শিবরামের পথেই এগিয়ে চলে যেখানে মানুষ, ঈশ্বর, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, ভক্তি, ভয় এবং সর্বোপরি জনশ্রুতিতে মেতে ওঠা মানুষের যে ট্র্যাজিক পরিণতি তা বারবার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দর্শকের চোখে ধরা দেয়। এ ছবি সাহসী। বর্তমান সমাজ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এমন এক কমেডি তৈরি করতে অবশ্যই সাহস লাগে। সুবিধাবাদের ভন্ডামি, ভীত মানুষকে আরো ভীত করে বশে রাখার যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তা আদিকাল থেকে একালে ক্রমাগত বহমান। এই বহমান সুবিধাবাদকে ব্যঙ্গ করে এই সিনেমা। সাধারণ মানুষের ভয়, অভাব, ক্ষুধা, আনুগত্যের ওপরেই তো তৈরি হয় ক্ষমতার ইমারত। আর এখানেই আবার ফিরে আসেন মৃণাল সেন –
“কত তন্ত্র কত মন্ত্র কত ভগবান
অভাব রচেন যিনি তিনি শক্তিমান!” (ছবি: কোরাস)
