কবিসম্বর্ধনা বরফি’ ও বাংলার প্রথম মেনুকার্ডের গল্প- সলিল হোড়
সময়টা সেদিন ছিল ১৯১১ সালের ৭ই মে। অতিথি-অভ্যাগতদের ভিড় উপচে পড়ছে ঠাকুরবাড়িতে, কারণ সেদিন কবিগুরুর ৫০তম জন্মদিন বলে কথা! খাওয়া-দাওয়াটাও সেদিন হওয়া উচিত বেশ জম্পেশ! তাই হেমেন্দ্রনাথের মেজো মেয়ে প্রজ্ঞাদেবী কবিগুরুর জন্য বানালেন একটা বিশেষ ধরনের বরফি, যার নাম দিলেন ‘কবিসম্বর্ধনা বরফি’। যেমন নাম, তেমনই স্বাদ। খেয়ে তারিফ করেছিলেন সবাই। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও নাকি বুঝতে পারেননি, বরফির মূল উপাদান ছিল ফুলকপি!!!
আজ আমি রবিঠাকুরের কথা বলবো না, বলবো ঠাকুরবাড়ির এক “ম্যাজিক শেফে”র কথা। হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজো মেয়ে, প্রজ্ঞাদেবী। রান্না নিয়ে নানান এক্সপেরিমেন্ট করে, দারুণ সব রান্না করে ফেলা, আর তাদের শ্রুতিমধুর সব নাম রাখা… এই ব্যাপারে দক্ষতার অধিকারিণী ছিলেন তিনি। তাই তাঁকে বরং বলা যেতেই পারে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রথম রন্ধন-গবেষিকা। রান্না নিয়ে তাঁর লেখা তিন খণ্ডের ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’, তখন ভীষণভাবে সারা ফেলেছিল প্রতিটি বাঙালি গৃহস্থের ঘরে। এই বইয়ে দেখা যায় তৎকালীন বাঙালি হেঁসেলের নিজস্ব ভাষা, যেমন –
ফোড়ন ফাটার শব্দ ‘চুটপূট’, কাঁচাটে বিস্বাদ গন্ধ ‘হালসে’, ডাল রাঁধবার চওড়া মুখ হাঁড়ি ‘তিজেল হাঁড়ি’, ফোড়ন দেওয়া মানে ‘ছুঁকা’, কচি আমের নাম ‘কড়ুই আম’, কচি লেবু ‘কড়াই লেবু’ ইত্যাদি।
আমরা আজকে কোনো ভোজসভায় যে মেনুকার্ড দেখি, বাংলার ভোজসভায় সেই মেনুকার্ড বা ‘ক্রমণী’ চালু করার পুরো কৃতিত্ব প্রজ্ঞার । লেখাটা সম্পূর্ণ তাঁর নিজের ভাষায়। ইংল্যান্ডের ভোজসভায় মেনুকার্ডের চল দেখে প্রজ্ঞা ঠিক করেছিলেন, বাংলার ধাঁচেও মেনুকার্ড বানাবেন। না ছাপালেও, হাতে সুন্দর করে লিখে দেওয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া হবে। এই রকম একটা ক্রমণী নিচে দিলাম–
‘জাফরাণী ভুনি খিচুড়ি
ধুঁধুল পোড়া
শিম বরবটি ভাতে
পাকা আম ভাতে
পটলের নোনা মালপোয়া
পাকা কাঁঠালের ভূতি ভাজা
কাঁকরোল ভাজা
ভাত
অড়হর ডালের খাজা
লাউয়ের ডালনা
বেগুন ও বড়ির সুরুয়া
ছোলার ডালের ধোঁকা
বেগুনের দোল্মা
আলুবখরা বা আমচুর দিয়ে মুগের ডাল
পাকা পটলের ঝুরঝুরে অম্বল
ঘোলের কাঁঢ়ি
রামমোহন দোল্মা পোলাও
নীচুর পায়স
নারিকেলের বরফি।’
শুধু ভালো রান্না করা নয়, নতুন রান্নাগুলোকে বিখ্যাত বা প্রিয় মানুষগুলোর নামে নামকরণ করতেন তিনি। এছাড়াও প্রায় ১২ রকম পান-সাজার আর বিভিন্নরকম পানমশলার প্রণালী লেখা আছে ওনার বইতে, যার নাম ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’।
এতো গুণের অধিকারিণী হওয়া সত্ত্বেও, তৎকালীন ঠাকুরবাড়ির হেভিওয়েট মেয়েদের জন্য প্রজ্ঞাদেবী তেমন ফুটেজ পাননি। অথচ, সবার অলক্ষে আমাদের বাঙালি সমাজের জন্য যেটুকু পেরেছেন, করে গেছেন… সেই উনিশ শতকের চার দেয়ালের বেড়াজালের মধ্যে থেকেই। রন্ধনশিল্পের মোড়কে, তিনি সৃষ্টি করেছেন নারীভাষা, গার্হস্থ্যের ভাষা, এবং লোকসংস্কৃতির এক প্রামাণ্য দলিল।
তথ্য ও ছবি সহায়তা : অনিতেশ চক্রবর্তী



