‘জয় শ্রীরায়, সত্যজিতের রাজনৈতিক ছবি’ – সৌভিক রায়
সত্যজিতের ছবি-তেই লুকিয়ে বাঙালির রাজনৈতিক ‘প্রতি-ভাষ্য’-র বীজ
সিনেমার আদত উদ্দেশ্য কী? স্রেফ বিনোদন, বাণিজ্য। না-কি সিনেমাতে লোকশিক্ষাও হয়! ধরা থাকে ইতিহাস, বাঁধা থাকে সময়। শ্রাব্য হোক বা পঠন-পাঠন মাধ্যম, সবের মধ্যে দৃশ্য-মাধ্যমের অভিঘাত সাধারণ জনমানসে অত্যন্ত বেশি। বঙ্গে সন্তোষী মায়ের পুজোর প্রচলনের নেপথ্যে যে একখানা ছবিই দায়ী, এ’কথা কি অস্বীকার করা যায়? আম জনতার কাছে পৌঁছে যাওয়ার জন্য চলচ্চিত্র একটা জরুরি মাধ্যম। ‘ক্লাস’ হোক বা ‘মাস’, মেসেজওয়ালা ‘আর্ট ফিল্ম’ বা ‘কমার্শিয়াল ফিল্ম’ চলচ্চিত্রের ভাগ অনেক কিন্তু অর্থ উপার্জন ছাড়াও এর একটি উদ্দেশ্য রয়েছে, তা হল বার্তা পৌঁছে দেওয়া, কার কাছে? সাধারণ মানুষের কাছে। যাঁদের নাম দর্শক। কী বার্তা? মূল্যবোধের বার্তা। রাজনৈতিক সচেতনতার বার্তা। নির্দেশকদের মধ্যে একদল তা পালন করে গিয়েছেন, কেউ কেউ আজও করেন। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা অতি…ক্ষীণ…! আর সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস…বিনোদন, বিনোদন, বিনোদন!
আবার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই প্রোপাগাণ্ডা। তার ইতিবাচক যেমন আছে, নেতিবাচকও দিক রয়েছে। যেমনটা আজ বিভিন্ন ‘ফাইলস’-এ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। হালের নির্দেশকেরা রাজনৈতিক বিষয়কে বাছছেন ছবি বানানোর জন্য বা বলা ভাল এমন ঘটনাকে বাছছেন; যার মধ্যে রাজনীতির বীজ আছে। এখন সবটাই এক পেশে, ডানপন্থার রমরমা। রাজনীতির বীজ থাকা ঘটনাকে পর্দায় তুলে আনাই কি রাজনৈতিক ছবি বানাতে আসা পরিচালকের কাজ? কেমন করে রাজনৈতিক ছবি বানাতে হয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশে?
উত্তর খুঁজতে উঁকি দিতে হবে সত্যজিতের ফিল্মোগ্রাফিতে। সত্যজিৎ ব্রাহ্ম ছিলেন। ফলে তাঁর ধর্মভাবনা আলাদা, চিরাচরিত নয়। কিন্তু তাঁর ছবিতে সেটি প্রভাব বিস্তার করেনি। ‘দেবী’তে তিনি রামপ্রসাদী ব্যবহার করছেন, ‘এবার তোরে চিনেছি মা…’। গানটির কথা তাঁরই লেখা। ‘আগন্তুক’-এ মামা মনমোহন মিত্রকে দিয়ে সুর করে শ্রীকৃষ্ণের নাম জপ করাচ্ছেন তিনি…‘হরি হরয়ে নমঃ কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ/যাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ’। কণ্ঠস্বর স্বয়ং সত্যজিতের। চলচ্চিত্রে নিজের ধর্ম-ভাবনাকে, নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে না-চাপিয়ে দেওয়াই রাজনৈতিক ছবি বানানোর প্রথম ধাপ। বাংলায় ধর্মের সঙ্গে মিশে থাকে ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকাচার। তাকে উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু সেটা কখনওই অন্ধ মোহ নয়।
সত্যজিৎ কি বামপন্থী ছিলেন? তিনি যে সমাজতন্ত্রকামী মানুষ ছিলেন, তা প্রমাণিত তাঁর প্রতি কাজে। বামপন্থার যে সংজ্ঞা পশ্চিমবঙ্গের সাড়ে তিন দশকের বাম শাসনে তৈরি হয়েছে। সে ধারাপাতে তিনি বামপন্থী ছিলেন কি-না বলা মুশকিল। তাঁর ছবি ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করেছে। হীরক রাজার দেশে-র মতো একনায়কতন্ত্র বিরোধী ছবি ভারতীয় উপমহাদেশে অদ্যাবধি তৈরি হয়েছে বলে মনে হয় না। হীরক রাজা স্বৈরাচরী, তিনি প্রশ্নহীন আনুগত্য চান, চান কৃষক-শ্রমিক-নাগরিক সবাই তাঁকে মানুক। তল্পিবাহক বাহিনী তৈরি করে তাঁদের মন্ত্রিত্ব দিয়েছেন, সভাকবি রেখেছেন প্রচারের জন্য। তাঁদের কাজ রাজার হ্যাঁ-তে ‘হ্যাঁ’ মেলানো, রাজার বচন ছড়িয়ে দেওয়া। হীরক রাজা গড়েছেন মগজ ধোলাইয়ের ঘর। একুশ শতকের ভারতে এগুলোই সংবাদমাধ্যম, হোয়াটস্ অ্যাপ ইউনিভার্সিটি, সোশ্যাল মিডিয়া, আইটি সেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ওরা যত বেশি জানে, যত বেশি পড়ে, তত কম মানে’, অতএব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ! এ জিনিস তো আজও বহালতবিয়তে রয়েছেন। প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করে যাচ্ছেন দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা, কারণ প্রতিষ্ঠানটি মুক্ত চিন্তার আগার।
শেষ দৃশ্যে সত্যজিৎ দেখাচ্ছেন, কৃষক, শ্রমিক, কয়লাখনির মজুর, ছাত্র সকলে মিলে দড়ি ধরে টান মেরে রাজার গদি ফেলে দিচ্ছেন। নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন শিক্ষক। সমাজের সব-স্তরের মানুষের সম্মিলিত শক্তিই ফ্যাসিবাদকে হারাতে পারে। হারানো যে সম্ভব, সে বিশ্বাস আনতে পারে শিক্ষা। কারণ চেতনা ও বিপ্লব শিক্ষার পথেই হাত ধরাধরি করে আসে।
গুগাবাবা-য় অবলীলায় তিনি বলে দিচ্ছেন, ‘ওরে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল?’ যুদ্ধের যে কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই, যুদ্ধের যে কোনও মঙ্গলদায়ক দিক নেই, হেলায় যেন সে’সার সত্য ঢুকে গিয়েছে বাঙালির মস্তিষ্কে, হৃদয়ে, মজ্জায়, রক্তে। ‘শাখাপ্রশাখা’য় উঠে এসেছে মূল্যবোধের পাঠ। পরিবারের বটবৃক্ষসম পিতৃপুরুষ মূল্যবোধ আঁকড়ে বাঁচেন। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেন, তাঁর আত্মজেরাও সেই সততা নিয়ে বাঁচে মাথা উঁচু করে। কিন্তু যুগের হাওয়ায় সকলেই হয়ে ওঠে দুর্নীতিপরায়ণ। বৃদ্ধের কোনও এক সন্তান দুর্নীতির পরিসরে খাপ খাওয়াতে পারেননি। চারিদিক তাঁর অচেনা লাগছে। সে মাথা তুলতে পারছে না। দুর্নীতির গ্রাসে, যাঁতাকলে থেকেও সে আপোস করছে না। এও এক সত্য! মধ্যবিত্তের সততা ছাড়া তো কিছুই নেই।
‘গণশত্রু’-তে সত্যজিৎ আঘাত করেছেন ধর্মীয় কুসংস্কারকে। চিকিৎসক হয়ে গেলেন দেশের শত্রু, কেন? কারণ ধর্মের অন্ধকার দিককে তিনি আক্রমণ করেছিলেন। ঈশ্বর বিশ্বাস মানুষকে গরল পান করতে বাধ্য করতে পারে না। ধর্মের বিষ, ধর্মের আফিমের যখন বাড়বাড়ন্ত
তখন অশোক গুপ্তদের দরকার পড়ে। শেষ অবধি যে ডাক্তার অশোক গুপ্তরা জেতেন, তাও দেখিয়েছেন সত্যজিৎ। ওঁর শেষ চিত্রনাট্য, ‘উত্তরণ’-এও তা-ই। অন্ধবিশ্বাসকে আক্রমণ। ওঝা, গুণীন, ঝাড়ফুক আজও আছে সমাজে। আজও সংবাদ শিরোনামে উঠে আসে, ‘তন্ত্রসাধনার বলি পাঁচ বছরের শিশু’, ‘ডাইন সন্দেহে গণপিটুনিতে মৃত্যু’র মতো খবর। এখানে বিজ্ঞান আর অন্ধবিশ্বাসের লড়াই। দ্বৈত্যের মাঝে এক চিকিৎসক। তবে সবেতেই বিজ্ঞানের জয়গান, সত্যের জয়গান গেয়েছেন সত্যজিৎ।
শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-কে নিহীত রয়েছে ওঁর জীবন দর্শন। উঠে এসেছে শহুরে ভদ্দরলোকদের উদ্দেশ্যে শ্লেষ। আদত জীবনের সংজ্ঞা, বোহেমিয়ান জীবন, মানুষ চেনার পাঠ। ভাষাগত জাতীয়তাবাদকেও সে যুগে দাঁড়িয়ে ছুঁয়েছেন সত্যজিৎ। দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছেন, ‘মায়ের ভাষা ভুলতে না চাইলে কেউ ভোলে না’। মনে রাখতে হবে, যে বছর বাবরি ভাঙা হচ্ছে, সেই কাছাকাছি সময় মুক্তি পাচ্ছে আগন্তুক। দেশের বদল, বিশ্বায়নকে ধরেছেন সত্যজিৎ। ধরেছেন ধর্ম, মানুষে মানুষে হানাহানিকে, বলেছেন, মঙ্গলময় পরমেশ্বরে বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। মামা এবং ব্যারিস্ট সেনগুপ্তের ড্যুয়ে নড়িয়ে দেয় নাগরিক জীবনের ভাবনাকে। যে সওয়াল সেখানে উঠেছে, সেগুলি আখেরে রাজনৈতিক সচেতনতায় জমা শ্যাওলাকে তুলে দেওয়ার জন্যে…থিতিয়ে পড়া গেলাসের জলে আলোড়নের জন্য…
রাজনৈতিক বিশ্বাস, আদর্শের বৈরীতা থাকবে। ধর্মের দাপাদাপি থাকবে। তা-বলে শিকড় কেন ভুলবে বাঙালি? রাজনৈতিক সচেতন বাঙালি পথ হারাবে কেন? বাঙালির ‘র্যাডিক্যাল’ অস্থিমজ্জা সব সময় তাঁকে ভাবতে বাধ্য করেছে, সে উত্তম। নিজেকে উত্তম ভাবার গরিমা থেকে বাঙালি অন্য প্রদেশের লোকেদের মেড়ো, খোট্টা, উড়ে, গুজু ডেকে এসেছে। এতে কোনও প্রাদেশিকতা নেই। বাঙালি যে সত্যিই উত্তম ছিল তা আর বলে দেওয়ায় অপেক্ষা রাখে না। সিনেমা বানিয়ে অস্কার পেয়েছে, লিখে নোবেল জিতেছে, বিজ্ঞানে চমকে দিয়েছে আইন্সটাইনকে…
এখনও বহু ক্ষেত্রে সে উত্তম কিন্তু কেনারাম, ভোগীরাম, বেচারাম, দুঃখীরাম তত্ত্বে বাঙালি এখন চতুর্থ শ্রেণিতে। ধীরে ধীরে বাঙালিকে দেশের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হচ্ছে। বড়ি খাওয়ানো হচ্ছে প্রোপাগাণ্ডার। হাজারো ফাইলস-র ভিড়ে সত্যজিতের হীরক রাজার দেশে, আগন্তুক, গণশত্রু-রাই শেখাবে প্রতিরোধের মন্ত্র। দেবে লড়ে যাওয়ার শক্তি, দম রাখার শক্তি। দিন বদলের স্বপ্ন বুকে বলবে খেলা ঘুরবে…









