পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা ফিচার
বাঙালির চিরকালীন ‘বেস্ট সেলার’ পঞ্জিকা-তেই লুকিয়ে ষোলোয়ানা বাঙালিয়ানার শিকড়
সৌভিক রায়
গোলাপি কাগজে মোড়া, গাঢ় নীল কালিতে ছাপা মলাট। ভিতরে সাদা-কালোয় ছাপা, অতি সাধারণ মানের কাগজ, কিছু রঙিন ছবি, অজস্র বিজ্ঞাপন আর আটপৌরে বাঙালিয়ানার শিকড়… এই নিয়েই পঞ্জিকা। নিরীহ চেহারার এক বই। এ বই আদতে গৃহস্থ বাঙালির অভিভাবক। বাংলার পালা, পার্বণ, দুর্গাপুজো থেকে রথযাত্রা, পূর্ণিমা থেকে একাদশী, দীপান্বিতা থেকে মৌনী অমাবস্যা, সব তিথি, উৎসব বয়ে আনে এ বই। বলা হতো, ‘তীর্থস্থানে গঙ্গায় স্নান করলে যে পুণ্য অর্জন হয়, পঞ্জিকা পাঠ শুনলে একই পুণ্য অর্জন হয়।’ নববর্ষের হালখাতা আর মিষ্টির সঙ্গে সঙ্গে পঞ্জিকা কেনার রীতি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বাঙালির ঘরে ঘরে পঞ্জিকার চল ছড়িয়ে পড়ে। বিক্রি আর জনপ্রিয়তায় সংবাদপত্রকেও টেক্কা দিত পঞ্জিকা। বর্ষফলের দৌলতে এই জনপ্রিয়তা। অচিরেই আম জনতার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া। প্রচলিত বিশ্বাস মতে, চৈত্রের শেষে গাজন উৎসব মিটলে কৈলাসে পার্বতী অবসর সময়ে শিবের কাছে বর্ষফল শোনেন, “কৈলাস ধামেতে বসি হর ও পার্বতী/ সুশীতল সমীরণ বহে মন্দগতি।/ পার্বতী কহেন, ‘প্রভু কহো ভগবান/ নববর্ষের ফল করহ ব্যাখ্যান/ কত পোয়া ফল হবে কত পোয়া জল/ সে কথা জানিতে বড় চিত্ত চঞ্চল’।” ঘরে ঘরে বর্ষফল পৌঁছে যেত পঞ্জিকার মাধ্যমেই। প্রাক-পঞ্জিকা যুগে একজন পুরুতঠাকুর বা আচার্যমশাই গৃহস্থের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে নববর্ষের দিন বর্ষফল শুনিয়ে যেতেন। টাকাকড়ি মিলত। যার নাম ছিল ‘সিধা’। গাঁ-গঞ্জের চণ্ডীমণ্ডপে পুরুতঠাকুররা নববর্ষের দিন পঞ্জিকা পাঠ করতেন, গোটা গ্রাম অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত, কবে কী তিথি, কোন পুজোর দিনক্ষণ কী, তা জেনে নিতে। ‘পঞ্চাঙ্গ’ শব্দ থেকে ‘পঞ্জিকা’র জন্ম। বার, তিথি, নক্ষত্র, করণ ও যোগ— পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সমষ্টি হল ‘পঞ্জিকা’। ব্যক্তিগত রাশিফল বা লগ্নফল দেওয়া থাকত না সে’যুগে। ব্যক্তিগত রাশিফল পঞ্জিকায় এসে জুড়ে একশো-সোয়া’শ বছর হল।
বাংলায় প্রথম পঞ্জিকার প্রচলন করেন কৃষ্ণনগরের স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামচন্দ্র বিদ্যানিধিকে দিয়েও বাংলা পঞ্জিকা প্রকাশ করান। বাংলা হরফে প্রথম পঞ্জিকা ছাপা হয়েছিল ১৮১৮ নাগাদ, বাংলার ১২২৫ সনে। জোড়াসাঁকোর জনৈক দুর্গাপ্রসাদ বিদ্যাভূষণ ছিলেন পাঁজির সংকলক এবং প্রকাশক ছিলেন রামহরি। তার আগে হাতে লেখা পঞ্জিকার চল ছিল। হাতে লেখা পঞ্জিকার নাম ছিল পাঁজিপুঁথি। কলকাতা, নবদ্বীপ বা ভাটপাড়ার পণ্ডিতদের হাতে লেখা পঞ্জিকার সুনাম ছিল। ছাপা পঞ্জিকার চেয়ে হাতে লেখা পঞ্জিকার গ্রহণযোগ্যতা ছিল বেশি। তারপর ছাপা পঞ্জিকায় গণৎকারদের নামোল্লেখ শুরু হলে ছাপা পঞ্জিকাও বাংলার ঘরে ঘরে প্রবেশাধিকার পায়।
বাবুকালচারেও মিশে ছিল পঞ্জিকা, “কর্ম শেষে নববর্ষে বাবু ঘরে আসে।/ হাতে মিষ্টি ইসেন্স শিশি আর পাঁজি পাশে।।” নববর্ষকে বেছে নেওয়া হয়েছিল পঞ্জিকা প্রকাশের তিথি হিসাবে। নববর্ষে কলেজ স্ট্রিটে যে নতুন বই প্রকাশের চল, তার জন্ম বটতলার হাত ধরে। পঞ্জিকার সুবাদেই নববর্ষে নতুন বই কেনার চল ছড়িয়ে পড়ে আম বাঙালির মধ্যে।
যদিও এখন নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে নতুন বাংলা সনের পঞ্জিকার দেখা মেলে।
ধর্মীয় প্রয়োজনে তিথি দেখা, জীবনযাপনের জন্য বিজ্ঞাপন দেখা, জোড়াফল। জনপ্রিয়তা পঞ্জিকাকে উনিশ, বিশ শতকে বিজ্ঞাপনের সেরা ‘প্ল্যাটফর্ম’ করে তুলেছিল। আবার অন্যদিকে পঞ্জিকাকে জনপ্রিয় করতে এসে যুক্ত হয়েছে ছবি। রেলগাড়ির ছবি, কলকাতার আকাশে বেলুন ওড়ার ছবি ঠাঁই পেতে শুরু করে পঞ্জিকার প্রথম দিকে। পঞ্জিকাকে আরও বিখ্যাত করতে পঞ্জিকার সঙ্গে ডাইরেক্টরিকে মিলিয়ে দেওয়া হয়। ভারতের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নাম, ঠিকানা, অফিসার-বিচারকদের নাম ও বেতনেরও উল্লেখ থাকতে শুরু হয়। পিএম বাগচির পঞ্জিকা ও ডাইরেক্টরি ছিল কাটতিতে শীর্ষে।
কোলকাতা ট্রাফট সোসাইটি এবং চার্চ অফ ইংল্যান্ডের পঞ্জিকা পাল্লা দিতে পারেনি। মহাবিদ্রোহের বছর অর্থাৎ ১৮৫৭-৫৮ সালে ভার্নাকুলার লিটারেচার কমিটি প্রথম তথ্যসমৃদ্ধ পঞ্জিকার প্রকাশ করে। অবিভক্ত বাংলার তিনশোর অধিক মেলার বিবরণ দেওয়া ছিল তাদের পাঁজিতে। আজ পাঁজিতে স্থানীয় উৎসব, মেলা স্থান পায়। ব্রিটিশ কোম্পানি স্যান্ডার্স অ্যান্ড কোনস বিলেতের ছবি দিতে শুরু করে পঞ্জিকাতে। তখন আড়াই-তিন লক্ষ পঞ্জিকা বিক্রি হতো বছরে। পরবর্তী কয়েক দশকে পঞ্জিকা রীতিমতো শাসন করে বাংলা প্রকাশনা জগৎকে। হুগলির শ্রীরামপুরের কৃষ্ণচন্দ্র কর্মকারের চন্দ্রোদয় প্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এই সময়টায়। মুদ্রণশিল্পের প্রসারে বেড়েছিল বাঙালির পাঁজি নির্ভরতা। প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিতে এক টাকা থেকে পঞ্জিকাগুলোর দাম নেমে আসে দু-তিন আনায়। উনিশ শতকে পঞ্জিকার এত বিপুল কাটতি ছিল যে, একই প্রেস থেকে বিভিন্ন পঞ্জিকা ছাপা হতো। আবার একই ব্যক্তির সম্পাদনায় ভিন্ন ভিন্ন পঞ্জিকা ছাপা হতো বিভিন্ন প্রেস থেকে। পঞ্জিকা বোঝাই করে ঝুড়ি মাথায় ফেরিওয়ালারা গ্রামে-গঞ্জে পাড়ায় পাড়ায় বিক্রি করতে বের হতো। তখন পঞ্জিকা ছিল দুই প্রকার, পূর্ণাঙ্গ পঞ্জিকা এবং হাত পঞ্জিকা বা পকেট পঞ্জিকা। লোকনাথ ডাইরেক্টরি বা এম বাগচির ফুল পঞ্জিকা ছিল সেকালের বেণীমাধব শীল। বাংলা ভাষায় মুসলমানদের জন্য ছিল বৃহৎ মহম্মদীয় পঞ্জিকা এবং খ্রিস্টানদের জন্য খ্রিস্টিয় পঞ্জিকাও প্রকাশিত হতো।
হালের বাংলায় দু’ধরনের পঞ্জিকার প্রচলন বেশি। গুপ্তপ্রেসের পঞ্জিকা, যা প্রকাশিত হয় বেনিয়াটোলা লেন থেকে। দুর্গাচরণ গুপ্তের বংশধররা আজ এই পাঁজি প্রকাশ করে চলেছেন। কবিরাজ স্ট্রিট থেকে প্রকাশিত বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা। যা অনেকটা তালমিছরি, বোরোলিনের বঙ্গ জীবনের অঙ্গ। আছে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকাও। এখন কমপক্ষে চল্লিশ-পঞ্চাশ লক্ষ পঞ্জিকা ছাপা হয়। পঞ্জিকাকে ঘিরে কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। ডিসেম্বর থেকে পঞ্জিকার চাহিদা বাড়ে বইপাড়ায়। ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিলে তা তুঙ্গে ওঠে। আম ক্রেতার পাশাপাশি থাকেন বইয়ের দোকানিরাও।
পঞ্জিকা কেবল বই হিসাবে আটকে নেই, সে যেন গেরস্থ বাড়ির জেষ্ঠ্য সদস্য। চৈত্র সংক্রান্তির পর নিমপাতা খাওয়া বারণ, জেষ্ঠ্যে পুত্রের মা লাউ খায় না, দ্বাদশীতে পুঁই শাক খাওয়া মানা, কবে চোদ্দ শাক খেতে হয়, কম্পন বৃত্তান্ত থেকে স্বপ্নফল, টিকটিকির টিকটিক থেকে হাঁচি, একাদশী থেকে অম্বুবাচী, সব কিছুর উত্তর আছে এক বইতে। পুজো-পালা-পার্বণের দিন, মলমাস, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, উপনয়নের শুভ দিনক্ষণ বাছতেও ভরসা পঞ্জিকা। যতই ফাইভ জি রাজত্ব করুক, এক ক্লিকে হাতের মুঠোয় থাকুক দুনিয়া, সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি, অষ্টমীর অঞ্জলির ‘টাইমিং’ জানতে পঞ্জিকাই নির্ভরযোগ্য। আজও পাঁজির সিংহাসন অনড়, অটুট!

