পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা সমালোচনা
সিনেমা এবং একশো বছরের নি:সঙ্গ ফিলিস্তিনি উপাখ্যান
বিদিশা বিশ্বাস
একটি ক্লোজ শট। একজন মহিলা। মুখের চামড়ায় বয়সের পরত। লেন্স ফুঁড়ে যে শব্দগুলো ছুঁড়ে দেন তাবড় পৃথিবীর দিকে, “…you don’t know very much about us. It’s okay, I am not here to blame you, I am here to tell you who is my son. But for you to understand I must tell you what happened to his grandfather.”
ন্যারেটিভ ফিরে যায় ১৯৪৮’এর জাফা শহরে। কেমন প্রজন্মের পর প্রজন্ম হয়ে প্রজন্মে গাঁথা হয় ভারাক্রান্ত ব্যাথারা।
একটি শুরুয়াত দরকার। একটি কনটেক্সট। সাম্রাজ্যবাদী শ্রেণীশত্রুর হাতে আক্রান্ত গোটা দুনিয়ার তামাম পিলপিলে মানুষ। সেই কবেকার কোন ভূগোলে আমাদের এই ভূখণ্ডে জুড়েছিল মধ্যপ্রাচ্য এমনকি আফ্রিকাও। গণ্ডোয়ানাল্যান্ডের মহাদেশীয় বিচ্ছেদ পেরিয়ে আমরা সব যে যার মতো গুছিয়ে নিয়েছি নিজেদের বসত-জমিন।
এপ্রিল ২০২৬– আপাত অতলান্ত অবান্তর পৃথিবী। আলোচ্য তিনটি ছবি।
“প্যালেস্তাইন ৩৬”। ১৯৩৬ এর প্যালেস্তাইন।
ওটোম্যান সাম্রাজ্যের পতন উত্তর প্যালেস্তাইন তখন ব্রিটিশ কবলে। জুমড আউট দৃশ্যপটে উঠে আসে প্যালেস্তিনিয়ান রেসিস্টেন্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে একটি জিয়োনিস্ট স্টেট তৈরির মহড়া— ইউরোপ থেকে দলে দলে ইহুদি এসে জড়ো হয় জাফা বন্দরে। তারপর বসে শুয়ে খাবলে নিতে থাকে জমি জায়গা। নিজের জমিতে নিজেরাই রিফিউজি বনে যায় প্যালেস্তিয়ান মানুষজন। পাহাড় কেটে তৈরি করা চাষের জমিতে, তারা ঝড়ে পড়া সজনে ফুলের মতো তুলো চাষ করেছে যেখানে প্যালেস্তিয়ান কৃষক, পুড়িয়ে ছাই করে দেয় জিয়োনিস্ট সেটেলাররা। “The history of Palestinian resistance did start neither on Oct 7th, 2023, nor in 1948 on the establishment of the state of Israel, nor even in the 80s during the Palestinian Intifada.” পরিচালক অ্যানমারি জাসির তাঁর দেশের ইতিহাস চিনিয়েছেন ১৯৩৬ থেকে, ব্যবহার করেছেন বহু আর্কাইভাল ফুটেজ। বিস্ময়ের কোনও অবকাশ নেই, এই ইতিহাস শুধু প্যালেস্তাইনের নয়, সমকালীন প্রায় সকল কলোনাইজড ভূখণ্ডের। ছবিটি দেখতে চেনা ঠেকে। এ কি আমার দেশেরও স্বাধীনতার ইতিহাস নয়? ওই তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, কেমন অবলীলায় আরব দেশগুলিকে শোষণের অমোঘ যন্ত্রে ফেলে পিষতে পিষতে একেবারে প্রান্তে নিয়ে যায়, আর নিজেদের আঁকড়ে রাখা জমিতে উদ্বাস্তু সর্বহারা মানুষ কেমন জীবনকে জড়িয়ে ধরে তখনও— অপূর্ব উদ্দামতায় নিজেদের হক বুঝে নিতে চায় কড়ায় গণ্ডায়। আমরাও কি বুঝিনি? বোঝেনি আফ্রিকার বা লাতিন আমেরিকার গরিবগুরবোরা? “এ পর্যন্ত প্রচলিত সমস্ত সমাজের ইতিহাস হলো শ্রেণী-সংগ্রামের ইতিহাস।” পরিচালকের কথন আসলে কোনও গল্প বলেনা, কোনও চরিত্রকে কেন্দ্রে স্থাপন করেনা, বরং সুতোর প্রান্তটি ধরিয়ে দেয়, যে সুতো ধরে উল্টোদিকে হাঁটলে পৌঁছে যাওয়া যায় আজকের ক্ষুধাপীড়িত গাজায়। ‘প্যালেস্তাইন ৩৬’ প্রকৃতঅর্থেই সেই সব চরিত্রের মগজের অলিতে গলিতে ঢুকে পড়ে, যেখানে ভয়, আকাঙ্খা, শৈশব ফেড আউট করে পুঞ্জীভূত হতে থাকে ক্ষোভ আর প্রতিরোধ।
শোষণযন্ত্রকে সচল রাখতে ইতিহাস গুলিয়ে দেওয়া শোষকের অন্যতম মারণাস্ত্র। রোমিলা থাপার বলছেন, “যাবতীয় সূত্রের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সচেতন ও সমালোচনাত্মক অনুসন্ধান আজ ইতিহাস লেখার পক্ষে অপরিহার্য…পার্থক্যটি গড়ে ওঠে দু-ধরনের মানুষের মধ্যে- একদল মানুষ ইতিহাস রচনায় উধৃত যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করে নিতে চান, সে বিষয়ে বিশেষ করে যোগ দেন, আর আরেক দল এ জাতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ করার দিকে আদৌ নজরই দেন না। সাক্ষ্যপ্রমাণকে উপেক্ষা করলে প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে যায়।” যাবতীয় প্রশ্নকে কালগহ্বরে নিক্ষেপ করে মানুষের চোখে জাত ধর্ম বর্ণের নেশা লাগিয়ে বংশানুক্রমে বাঁদর নাচ নাচানোই বুর্জোয়া ক্ষমতার লক্ষ্য। তাই বারবার ধারা অনুধারা বেয়ে আমাদের ফিরে যেতেই হবে ইতিহাসের কাছে, স্বচ্ছ দৃষ্টিতে এঁফোড় ওঁফোড় করতে হবে সমাজের খোলনলচে।
‘প্যালেস্তাইন ৩৬’ এর ওয়াইড লেন্সিং যে ম্যাক্রোকসমকে চিত্রায়িত করে, ‘অল দ্যাটস লেফট অফ ইউ’ জুম ইন করে ঢুকে পড়ে একটি পরিবারের ক্যাটাস্ট্রফিক স্তম্ভনে। নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ শুরু হয় ১৯৮৮’র প্যালেস্তিনিয়ান ইন্তিফাদায়। প্রাণসম জমিন রক্ষার দাবিতে আবার মিছিল করে ধুঁকতে থাকা প্যালেস্তিনিয়ান মানুষ। আর ইসরাইলি গুলিবৃষ্টিতে আহত হয় ছবির অন্যতম চরিত্র নূর। গল্প পিছন ফিরে চায় নূরের জন্মের আগের জাফা শহরে, যখন নূরের পিতাকে কবিতা শেখায় নূরের পিতামহ, ছোট্ট সেলিম আদুরে গলায় বলে চলে “I am the sea. In my depths all treasures dwell. Have they asked the divers about my pearls? Woe unto you! I perish, and so do my beauties. And your remedy, though scarce, is my cure!” বলা চলে এই শব্দবন্ধই আখ্যানের দর্শন। ১৯৪৮ এর জাফা, তখনও প্যালেস্টিনিয়ান শহর, তখনও কমলালেবুর মস্ত সব বাগানের গল্পের সঙ্গে মানুষের গল্প জুড়ে জুড়ে থাকার উত্তাপ। তারপর অকস্মাৎ বাগানের গাছেরা পুড়ে খাক হয় সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী প্রগল্ভে। এরপর ইসরায়েল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং ফলস্বরূপ লক্ষ লক্ষ প্যালেস্তিনিয়ান মানুষের জেলবন্দী হওয়া অথবা উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নেওয়া অপর কোনও ভূখণ্ডে। উক্ত পরিবারটি ভিটে ছেড়ে বেরিয়ে পরে কোন আত্মীয়ের উদ্দেশ্যে। আবারও পরিচিত দৃশ্যপট। ‘৪৭ আর ৭০ দশকের মানচিত্রের কাটাকুটি খেলায় জন্ম নেওয়া লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর মাইল মাইল হাঁটা, কোথায় পাওয়া যায় চারটি ভাত আর মাথা ঢাকার ছেঁড়াফোঁড়া একটা প্লাস্টিক। বগলে একটা পোটলা, কাঁখে দুধের শিশু, পাঁজাকোলা করা থুত্থুরে বাপ মাকে নিয়ে হেঁটে চলেছে ইতিহাস। শেরিফ, চার সন্তানের পিতা ভিটে আঁকড়াবার চেষ্টা করে মুখ থুবড়ে পড়ে ইজরায়েলি জেলে। গল্পের চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পরিবার ফিরে পেলেও আজন্মের বাসভূমি জাফায় ফেরা হয়না আর কখনো। জাফা তখন ইজরায়েলের অংশ। বুড়ো ১৯৬৮’তে ছোটখাটো দু-কামরা এই বাটির সামনের একফালি গলিতে মধ্যরাতে ঘুমের অচেতনে হাতড়ে বেড়ায় জাফার মস্ত উঠোনের সেই ডুমুর গাছটিকে। ছোট্ট নাতির সঙ্গে হাত কপালে ঠেকিয়ে গেয়ে যায় নিজের দেশের গান, নাতির ছোট্ট মাথায় গেঁথে দিয়ে যায় নিজের জমিনের প্রতি অধিকারবোধ। ১৯৮৮’তে এই মাথা ফুঁড়েই বেরিয়ে যায় গুলি। দিশেহারা মা বাবা সন্তান বাঁচানোর আর্তিতে ছুটে বেড়ায় এই হসপিটাল থেকে ওই হসপিটাল, কাগজের খোঁজ চতুর্দিকে, প্রাণের থেকেও দামি পরিচয়ের কাগজ, ওলটপালট বাড়ি থেকে কাগজ নিয়ে যেতে হয় ইজরায়েলের হাইফা শহরে। অপেক্ষা- দিনমান অপেক্ষা। নূর আর ফেরেনা। নূর শহীদ হয়ে যায়। এখানেই বীক্ষণ বুনে দিয়েছেন পরিচালক তথা অন্যতম অভিনেতা শেরিন দাবিস। নূরের ব্রেন ডেথের পর নূরের বাবা মা এক দোলাচলের সম্মুখীন হয়, হসপিটাল থেকে আর্জি জানানো হয়, যদি নূরের অর্গ্যানসমূহ দান করতে তারা চায়, কিছু প্রাণ তাতে বাঁচতে পারে। বাবার মনে ঘুরপাক খায় প্রশ্ন- প্যালেস্তিনিয়ান শহীদ ছেলের শরীরের অংশে প্রাণ পেয়ে কোনও ইজরায়েলি ছেলেই হয়তো গুলি করে হত্যা করবে নূরের মতোই ছটফটে অন্য কোনও এক বা একাধিক প্রাণ। এরা এক মৌলানার শরণাপন্ন হয়, কি অপূর্ব এক কবিতা হয়ে ওঠে মৌলানার ব্যাখ্যা। মৌলানা বলে “হাদিথ বলেছেন, কোনও মৃত মানুষের হাঁড় ভাঙা আর জীবিত মানুষের হাঁড় ভাঙার মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই।” তাহলে কি দেহযন্ত্র দানের অর্থ পাপ? মৌলানা বলে, “হাদিথের এই কথাকে দুভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, প্রথমটি অবশ্যই পাপ। দ্বিতীয়টিতে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, হাদিথ আসলে মানুষকে সম্মান করার নির্দেশ দিয়েছেন, জীবিত বা মৃত।” কি অদ্ভুত দক্ষতায় কি নিপুণ মানবতায় পরিচালক এই কথোপকথন রচনা করেছেন, যেখানে তিনটি চরিত্র বিভিন্ন ম্যাগনিফিকেশনে তাদের যাবতীয় অনুভব নিয়ে হাজির হয়ে বিশ্বচলচ্চিত্রের আলেখ্যে সময়োত্তীর্ণ হয়ে ওঠে আপন মহিমায়। মৌলানা বলে “your humanity is also resistance. Don’t forget the power of your humanity. It’s the one thing no one can take away from you.” চরিত্ররা তাদের সকল ঐতিহাসিকতা বেয়ে শূন্য চরাচর ছাপিয়ে কেমন মানুষ হয়ে ওঠে।
স্মৃতি যেমন নদীর মতো পলি ফেলে যায় সময়ে সময়ে যা কখনও কেবল বাস্তবে আছড়ে ফেলে ব্যথার ঘূর্ণাবর্ত তৈরি করে, সেখানেই পাক খেয়ে খেয়ে মরে আবহমান কালের উদ্বাস্তুরা। ২০২৪, গাজা, প্যালেস্তাইন। এক ঘর উদ্বাস্তু। ঘরছাড়া একটি পরিবার। প্রাণ বাঁচাতে গাড়ি বোঝাই হয়ে বেরিয়ে পড়েছে অন্য কোনো ছাদ খুঁজতে। পথেই ইজরায়েলি সেনার গুলিতে নিথর হয়েছে সবাই, আর ওই রক্তাত দেহগুলি আগলে বেঁচে আছে একটি পাঁচ বছরের শিশু, হিন্দ রাজাব। কোনোভাবে ওয়েস্ট ব্যাংকের রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক অফিসে পৌঁছেছে হিন্দের ফোন কল। বেন হানিয়ার ডকু-ড্রামা “দ্য ভয়েস অফ হিন্দ রাজাব”এ ব্যবহৃত হয়েছে হিন্দের ডকুমেন্টেড কণ্ঠস্বর। সবরকম চেষ্টা করে, নিয়ম মেনেই এম্বুলেন্স পাঠাতে কয়েক ঘণ্টা সময় ক্ষয় এবং এম্বুলেন্স পৌঁছনোমাত্র ইজরায়েলি খুনেবাহিনী কর্তৃক দুজন প্যারামেডিকসসহ হিন্দের হত্যাই ছবির প্রেক্ষিত। গোটা ছবি জুড়ে দৃশ্যত আমরা কখনোই ওই রেড ক্রিসেন্ট অফিসের বাইরে বেরোইনা, ক্লোজ আর মিড ক্লোজ শটে আমরা চরিত্রগুলিকে অসহায়তার ভারে কেবলই নুব্জ্য হতে দেখি, আর এই অফিসের চার দেওয়ালের ভিতরে এক দুর্নিবার ক্লস্ট্রোফোবিয়ার জন্ম হতে দেখি, যা পর্দার ওপার থেকে হিলহিলে সরীসৃপের মতো ঢুকে পড়ে আমাদের ব্যক্তি তথা সমষ্টির চিন্তার গভীরে। “দ্য ভয়েস অফ হিন্দ রাজাব” ছবিটির মুক্তি ভারতবর্ষে ব্যান করা হয়েছে। ভাবতে ভালো লাগে, যে মাত্র দেড় ঘণ্টার একটি সিনেমা অফুরন্ত শক্তিধর, ১৫০ কোটির টুঁটি করায়ত্ত করে রাখা সন্ত্রাসবাদী ফ্যাসিজমের মগজেও কেমন ভয় ঢোকাতে পারে।
ছবিটি প্রসঙ্গে এখানে একটি প্রশ্ন দানা বাঁধে, নৈতিক সর্বোপরি রাজনৈতিক। ১৯৩৫ উত্তর ফিলিস্তিনি দুনিয়ায় যে মানুষ পিছু হটতে হটতে চিৎপাত, মরে যেতে যেতে, যেতে যেতেও যাদের কপালে জোটেনি এক টুকরো ঠিকানা, যে লাশেরা ভূত হয়ে মাথা কুটে খুঁজে চলেছে ফেলে যাওয়া স্বজনের পেটে দেওয়ার মতো এক আধটা পাউরুটি, তাদের হাহাকার, যন্ত্রণা কতটুকুই বা পৌঁছেছে এই গ্রহের নিরবিচ্ছিন্ন সুখের কাছে? অর্থে ঝিম লাগা মানুষের কাছে পৌঁছতে একটি খুন হয়ে যাওয়া বাচ্চার বেঁচে থাকার শেষ আর্তিটুকুও ব্যবহার করতে হয় আমাদের! শিল্পের দোহাই দিয়ে পাঁচ বছরের শিশুর হত্যাকে উপস্থাপন করতে হয় সিনেম্যাটিক কায়দায়! মস্তিষ্কে ধাঁধাঁ লাগে। শরীর থেকে লজ্জার খোলস ঝরে পড়েছে সেই যে কবে!
ভিন্ন সময়ের প্রেক্ষিতে হলেও তিনটি ছবিই বানানো হয়েছে শেষ দু-তিন বছরের মধ্যে। অপ্রয়োজনীয় তথ্য, তাও বাজারি কায়দায় ছুঁয়ে যেতে হয়, সারা পৃথিবীর নামী দামি ফেস্টিভালগুলোয় ছবিগুলির স্ক্রিনিং, অভূতপূর্ব রিঅ্যাকশন, অ্যাকাডেমি এওয়ার্ডসে তিনটি ভিন্ন দেশ থেকে “best feature film in foreign language” ক্যাটাগরিতে ছবিগুলির মনোনয়ন এবং সর্বোপরি তিনটি ছবির সঙ্গেই এক্সেকিউটিভ প্রোডিউসার হিসেবে জুড়ে যাওয়া মার্ক রাফেলো, হাভিয়ের বারডেম, রুনি মারা, ওয়াকিন ফিনিক্স সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নামের প্রসঙ্গ। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে এঁরা সকলে চিৎকার করে আমেরিকা-ইজরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পক্ষ নিয়েছেন। নির্যাসের আহরণ।
আপাদমস্তক ফ্যাসিজমে শ্বাসরুদ্ধ ভারতবর্ষে আমরা এই ছবি তিনটির রেসিস্টেন্সের স্পর্ধাকে উদযাপন ছাড়া আর কি করতে পারি! পাশে দাঁড়াতে পারি, ততক্ষণ চিৎকার করতে পারি, যতক্ষণ শোষক বধির না হয়। পক্ষ নেওয়ার সময়ে ফ্যালফ্যাল চাহনি থেকে ফিরে এসে জোঁট বাঁধতে পারি। শাসকের চোখে চোখ রেখে সমঝোতাকে তুড়ি মেরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি। প্যালেস্তিনিয়ান লেখক তথা গেরিলাযোদ্ধা ঘাসান কানাফানি যেমন বলেছিলেন, “যে কোনো সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে কোনো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মাঝের ‘peace talk’ একটি তলোয়ারের দিকে গলার নলি এগিয়ে দেওয়ার নামান্তর। শিকড় ছিন্ন করা হয়েছে যে মানুষের, ভিটেহীন বুভুক্ষু সেই সব মানুষের কাছে মাটির অধিকার এবং আত্মমর্যাদা জীবনের অধিকারের চেয়ে কিছু কম গুরুত্বের নয়।”
এই প্রবন্ধের লেখক হিসেবে দায় স্বীকার করে নিই, কোনো ছবির সমালোচনা লেখা আমার উদ্দেশ্য নয়। আজকের পৃথিবীতে পিছনের ও সামনের অনন্ত নিকষ আঁধারের দিকে তাকিয়ে আলোর অনুভব ভুলতে বসেছি। লক্ষ লক্ষ খুন হয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের লাশ চোখ-সওয়া হয়ে যায় যেখানে, সেই ভূখণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে সেই ভূখণ্ডকেই আপ্রাণ ভালোবেসে এই ছবি তিনটি বানানো। একমুখী তিনটি প্লট কেবল খুঁজে চলে, খুঁজে নিতে বলে একটা জাতির শত বৎসরের নি:সঙ্গতাকে। আর সেই নি:সঙ্গতার আখ্যানকে সমালোচনা করার অধিকার প্রদর্শনের পথ থেকে সরে দাঁড়িয়ে গলা চিরে দ্যার্থহীন হয়ে আমি প্যালেস্তাইন, লেবানন, সিরিয়া সহ সকল নিপীড়িত শ্রেণীর মুক্তি দাবী করি, করেই যাবো, আমি মার্কিন-ইজরায়েলি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, হবোই তদুপরি এই অন্যায়কে অন্যায় বলে স্বীকার না করা মানুষের মুখে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে থুতু দিই, দেবোও। কারণ ইতিহাস রাজা রাজরার দেশ দখলের গৌরব হয়ে থাকবেনা, ইতিহাস রচনা হবে দারিদ্র্যে মুখ গুঁজে থাকা না খেতে পাওয়া পাঁজরের হাঁড় ঠেলে বেরিয়ে আসা মানুষে ভর করে, ইতিহাস রচনা হবে লক্ষ কোটি লাশের উপর, ইতিহাস রচনা হবে মাটি আঁকড়ে জানকবুল লড়াই করা জীবনের, জীবনের জয়গানের।

