ব্রিটিশ ভারতে প্রথম ফাঁসির ২৫১ বছর, প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কতটা বদলে দিয়েছিল কলকাতাকে? – সৌভিক রায়
সরযূ তীরের অযোধ্যা আর গঙ্গাপাড়ের কলকাতাকে মিলিয়ে দিয়েছে এক মহাপাপ, ‘ব্রহ্মহত্যা’। ঋষি বিশ্বশ্রবার পুত্র মহাপণ্ডিত, ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠ রাবণকে বধ করেন শ্রীরামচন্দ্র। অন্যায়ের উপর ন্যায়ের জয়ের প্রেক্ষিত বিচার করলে, মহাকাব্যের ‘এর’ চেয়ে উত্তম সমাপ্তি সম্ভব নয়। কিন্তু লঙ্কাধিপতি যে স্বয়ং ব্রহ্মার বংশধর, ব্রাহ্মণের পুত্র। তাই তাঁর হত্যা হলো ব্রহ্মহত্যা। শাস্ত্রে যাকে বলা হয় মহাপাপ। বনবাস থেকে ফিরে অযোধ্যার সিংহাসনে বসার আগে রামকে ব্রহ্মহত্যার পাপ স্খলন করতে হয়েছিল। দক্ষিণে রামেশ্বরম, উত্তরে ঋষিকেশের মতো পুণ্যক্ষেত্রে তপস্যা করতে হয়েছিল নবদুর্বাদলঘনশ্যামকে। তাতেও অযোধ্যার বহু ব্রাহ্মণ সন্তুষ্ট হননি। তাঁরা অযোধ্যা ছেড়ে সরযূ নদীর অপর তটে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক তেমনই, ১৭৭৫ সালের ৫ আগস্টের এক ঘটনার জন্য কলকাতা ছেড়েছিলেন কুলীন ব্রাহ্মণেরা। অনেকেই চলে গিয়েছিলেন উত্তরপাড়া, বালীগ্রাম ইত্যাদি অঞ্চলে অর্থাৎ গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে। যে শহরে ব্রহ্মহত্যা হয়েছে, সেখানে থাকলে যদি অমঙ্গল হয়! জাঁকিয়ে বসেছিল আতঙ্ক। তার অভিঘাত এতই তীব্র ছিল যে, মফঃস্বলের ব্রাহ্মণেরা কোনও কাজে তদানিন্তন কলকাতায় গেলেও জলগ্রহণ করতেন না।
২৫১ বছরে আগে ঠিক কী হয়েছিল? হয়েছিল মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি। যা ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ফাঁসি। সেই মৃত্যুসংবাদ গ্রাস করেছিল গোটা বঙ্গদেশকে। মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি ছিল এক আইনি হত্যা, সুচারুভাবে পরিকল্পনা করা এক ষড়যন্ত্র। হেস্টিংসের চক্রান্তে দোষী প্রমাণিত হয়েছিলেন নন্দকুমার। ফোর্ট উইলিয়ামে ‘সুপ্রিম কোর্ট অব জুডিকেচার’-র প্রথম প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পে রায়দানে বন্ধু হেস্টিংসের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছিলেন। নন্দকুমার আইনি লড়াইয়ে অনেক দূর এগিয়েছিলেন। কিন্তু চক্রান্তের জাল কাটতে পারেননি। জুটেছিল মৃত্যুদণ্ড।
১৭০৫ সালে বীরভূমের ভদ্রপুর গ্রামে নন্দকুমারের জন্ম। আলিবর্দির আমলে তিনটি পরগনার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন তাঁর বাবা পদ্মনাভ রায়। রাজস্বের কাজকর্মে নন্দকুমারও পটু হয়ে ওঠেন। দেওয়ান থেকে হন ‘মহারাজা’, মীরজাফর দিল্লির সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে ১৭৬৩ সালে নন্দকুমারের জন্য ‘মহারাজা’ উপাধি নিয়ে আসেন।
বৈষ্ণব গুরু রাম ঠাকুরের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন নন্দকুমার। নন্দকুমার ছিলেন ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ, তার একাধিক নজির আছে। বীরভূমের কালী মন্দির থেকে বাসুদেবপুর তালুকের জোড়া শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা, সবই নন্দকুমারের ধর্মপ্রীতির নজির। বাড়িতে ভোজের আয়োজন করে ব্রাহ্মণদের খাওয়ানো, উপহার দেওয়া, পা ধুইয়ে দেওয়া ইত্যাদি করে পুরোহিত, বামুন ঠাকুরদের মন জিতেছিলেন নন্দকুমার। আবার রাজস্বের কাজ দক্ষতার সঙ্গে করে ক্লাইভদেরও প্রিয় পাত্রে পরিণত হন।
পলাশির যুদ্ধের সময় হুগলির ফৌজদার ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে তিনি নবাব মীরজাফরের দেওয়ান হন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পরে তিনি ছিলেন চারজন ঊর্ধ্বতন নায়েবের অন্যতম। ১৭৬৪ নাগাদ কোম্পানি তাঁকে বর্ধমান‚ নদিয়া এবং হুগলি জেলায় কর আদায়ের দায়িত্ব দেয়। এ’কাজের ভার ছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের উপর। হেস্টিংসের কাজে সন্তুষ্ট ছিল না কোম্পানি। তাঁকে সরিয়ে নন্দকুমারকে দায়িত্ব দেওয়া, মানতে পারেননি হেস্টিংস। সেই বিবাদের শুরু।
১৭৭৩ সালে হেস্টিংস বাংলার গভর্নর জেনারেল পদে বসলেন। তাঁর বিরুদ্ধে লিখিতভাবে দুর্নীতির অভিযোগ আনলেন নন্দকুমার। অভিযোগ‚ মৃত প্রয়াত প্রাক্তন নবাব মীরজাফরের স্ত্রী মুন্নি বেগমের থেকে বহু অর্থ ঘুষ নিয়েছিলেন হেস্টিংস। বিনিময়ে নাবালক নবাব মুবারক-উদ-দৌল্লার অভিভাবক হিসেবে মুন্নি বেগমকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন৷ রেগুলেটিং অ্যাক্ট-র প্যাঁচে গভর্নর জেনারেলকে কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হতো। কাউন্সিলের চারজন সদস্যের তিনজনই হেস্টিংসের বিরুদ্ধে ছিলেন। এরা হলেন ক্ল্যাভারিং, ফ্রান্সিস ও মনসন। নন্দকুমার হেস্টিংসের এই বিরোধীদের কাছে দুর্নীতির বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ পৌঁছে দেন। বেশ কিছু দেশীয় জমিদার ও মুন্নি বেগমের কাছ থেকে হেস্টিংস যে উৎকোচ গ্রহণ করেছিলেন তাও নন্দকুমার ফাঁস করে দেন। কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স-র কাছে অভিযোগ যায়। মুখ বন্ধ রাখার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ নন্দকুমারকে দিতে চেয়েছিলেন হেস্টিংস। তা না নিয়ে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন নন্দকুমার।
ক্ষোভে ফেটে পড়েন হেস্টিংস। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে নন্দকুমারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে আরম্ভ করেন। জনৈক মোহনপ্রসাদ নন্দকুমারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। সুপ্রিম কোর্ট গঠনের চার বছর আগের একটি উইল জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। ফেঁসে যান নন্দকুমার।
সুপ্রিম কোর্ট নন্দকুমারের বিচার শুরু করে। সে সময়ের আইনে জালিয়াতির জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল না। তাও নন্দকুমারকে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়। কারণ, বিচারপতি এলিজা ইম্পে তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য এক প্রকার তৈরি ছিলেন। কারণ বন্ধুপ্রীতি। ওয়েস্ট মিনিস্টার স্কুলে ইম্পে ছিলেন হেস্টিংসের সহপাঠী।
পাশাপাশি নন্দকুমারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও তছরূপের অভিযোগ করেছিলেন হেস্টিংস। অভিযোগ ছিল‚ জনৈক বোলাকি দাস শেঠের নাম ভাঙিয়ে ৭০ হাজার টাকা নিয়ে নিয়েছেন নন্দকুমার। আসল বোলাকি দাস শেঠ বহুদিন আগেই মারা গিয়েছিলেন। এলিজা ইম্পের দৌলতে এই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলো। রায় গেল নন্দকুমারের বিপক্ষে। ‘দোষী’ সাব্যস্ত হলেন মহারাজা নন্দকুমার। শাস্তি হলো প্রাণদণ্ড। দিন নির্ধারিত হল ১৭৭৫ সালের ৫ আগস্ট। স্থান বেছেছিলেন খোদ মহারাজা নন্দকুমার। গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে মৃত্যুবরণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। শেষ ইচ্ছে পূরণ করেছিল সাহেবরা। গঙ্গার সামনেই ফাঁসি কাঠে ঝুলে পড়েছিলেন নন্দকুমার… ‘‘নন্দকুমারের মা কাঁদে ওই গঙ্গার পানে চেয়ে/ আর না আসিবে বাছা জোড়া ডিঙি বেয়ে।’’ (ছড়ায় মোড়া কলকাতা, পূর্ণেন্দু পত্রী)
তৎকালীন কুলিবাজারে অর্থাৎ খিদিরপুর ব্রিজ থেকে নামার মুখে হেস্টিংস মোড়ে কুয়ো খনন করা হয়েছিল। প্রায় ১৫ ফুট গভীর কূপ। কপিকল ও কাঠের পাটাতন লাগিয়ে উঁচু করে তৈরি করা হয়েছিল ফাঁসির মঞ্চ। সাধারন জনগন যাতে অপরাধীর অন্তিম পরিণতি স্বচক্ষে দেখতে পারেন সেই কারণেই বন্দোবস্ত। আজ কুয়োটি ‘ফাঁসি কুয়ো’ বলে পরিচিত। কেউ কেউ ডাকেন ‘ফাঁসিঘর’ নামে। আজকের বিদ্যাসাগর সেতুর কাছেই রয়েছে প্রাচীন কুয়োটি। এখন যা আবর্জনা ভর্তি রেলিং ঘেরা এক জায়গা।
নন্দকুমারের ফাঁসির দিন জনপ্লাবনে ভেসে গিয়েছিল খিদিরপুর। সর্বসমক্ষে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল নন্দকুমারকে। ঢল নেমেছিল আম জনতার। শ্রীপান্থ লিখে গিয়েছেন, মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি দেখে সকলে গঙ্গাস্নান সেরে ফিরেছিলেন। কারণ নন্দকুমার ছিলেন ব্রাহ্মণ। ব্রহ্মহত্যা দেখার মহাপাপ ধুয়ে ফেলার জন্য গঙ্গাস্নানই ছিল বিধান। বাড়িতে বাড়িতে পালিত হয়েছিল অরন্ধন। দিনটিতে ব্রাহ্মণেরা অনেকেই দাঁতে কুটোটি কাটেননি। শয়ে শয়ে মানুষ কলকাতা ত্যাগ করলেন পরবর্তী বছরগুলিতে, একটাই ভয়। ব্রহ্মহত্যার শহরে থাকা যায় না। বহু অভিজাত ব্রাহ্মণ পরিবার কলকাতা ত্যাগ করে গঙ্গা পেরিয়ে কলকাতার ত্রিসীমানা থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে চলে যান। অনেকে চলে গিয়েছিলেন বারাণসী। ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণের মৃত্যুতে শহরজুড়ে ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল। হেস্টিংস আর ইম্পে কিন্তু রেহাই পাননি। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট হেস্টিংস ও এলিজা ইম্পেকে দোষী সাব্যস্ত করে পদচ্যুত (ইমপিচ) করে। কিন্তু বহু পরে, ভারত স্বাধীন হওয়ার অনেক পর অপরাধীর তকমা ঘোচে নন্দকুমারের।

