“জলভরা, মনোহরা, মেচা-র ‘জিআই’ প্রাপ্তি! মিষ্টির ময়দানে তিন গোল বাংলার” – সৌভিক রায়
এক ধাক্কায় বাংলার বেশ কয়েকটি পণ্য ‘জিআই’ তকমা পেয়েছে। তাতে রয়েছে তিনটি বিখ্যাত মিষ্টি। দু’টি হুগলি জেলার এবং একটি বাঁকুড়ার। এক-আধটা মিষ্টির জন্য বাঙালি ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলকে সোজা ব্যাটে ‘বাপি বাড়ি যা’ করে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারে। এহেন মিষ্টিখোর বাঙালি জাতির বড় আনন্দের দিন, বিশ্বকাপ আবহে দেশের মিষ্টির ময়দানে রীতিমতো তিন তিনখানা গোল দিয়েছে বাঙালি।
বাংলার ভেনঘরের ময়রা, মোদকেরা ছিলেন এক একজন বিজ্ঞানী। ছানা, ক্ষীর দোলে-পিষে কী-ই না বানিয়েছেন তাঁরা! জলভরার জন্মদাতা সূর্যকুমার মোদক। সন্দেশের ভিতরে জল! ভদ্রেশ্বরের তেলেনিপাড়ায় ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়দের জমিদারবাড়ি। সম্ভবত সে’বাড়ির এক মেয়ের বিয়ে হয়েছিল বৈদ্যবাটির জমিদার বাড়িতে। বাংলার ১২৯০ সনে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের গিন্নিরা বায়না ধরলেন, জামাইষষ্ঠীর দিন জামাইকে ঠকাতে হবে। এমন মিষ্টি গড়তে হবে, তা মুখে দিলেই জামাই বোকা বনে যাবে। সূর্য মোদকের ডাক পড়ল। চন্দননগর-ভদ্রেশ্বর সীমানা লাগোয়া জায়গায় ছিল সূর্য মোদকের দোকান। জমিদারবাড়ির গিন্নিদের আবদার, চ্যালেঞ্জ নিলেন সূর্য মোদক। বানানো হল মিষ্টি।


জামাইষষ্ঠীর দিন বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির জামাইয়ের পাতে পড়ল সূর্যকুমার মোদকের বানানো নয়া মিষ্টি। নাম জলভরা তালশাঁস। জামাই যেই কামড় দিয়েছেন, সঙ্গে সঙ্গে তার ভিতর থেকে গোলাপের নির্যাস মেশানো দোলোর (ঢেলা চিনি) রস ছিটকে পড়ল জামাইয়ের পাঞ্জাবিতে। হাসির রোল উঠল জমিদারবাড়িতে। বাংলার মিষ্টির ইতিহাসে অমর হয়ে গেলেন সূর্য মোদক ও তাঁর আবিষ্কার। চন্দননগরের জলভরার বিশেষত্ব হল, সন্দেশের পেটে জল ভরার পরেও, তাকে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে কেবল চন্দননগর। অন্য জায়গায় জলভরা শুয়ে থাকে। সূর্য মোদকের নাতি ললিতচন্দ্র মোদক প্রথম জলভরার কাঠের ছাঁচ বানিয়েছিলেন। যা আজও সূর্য মোদকের দোকান রয়েছে। চন্দননগরের বারাসাতের দোকানটিই মূল। তবে বেশ কয়েকটি দোকান আছে সূর্য মোদকের নামে।
১২৫৩ বঙ্গাব্দে সূর্য মোদকের জন্ম। ভদ্রেশ্বরের বারাসাতে তাঁর বাবা মাধবচন্দ্র মোদক দোলোর ব্যবসা শুরু করেন। দোলো হল আখের রস থেকে দেশীয় পদ্ধতিতে চিনি তৈরি করার মধ্যবর্তী পর্যায়ে উৎপন্ন দানাযুক্ত এক ধরনের গুড়, যা জ্বাল দিয়ে চিনি তৈরি হয়। সূর্য মোদক কেবল ছানায় নয়, কলম হাতেও কেরামতি দেখিয়েছেন। তাঁর লেখা গীতগোবিন্দের পাঁচালী সংস্করণ আজও চন্দননগরের ফরাসি মিউজিয়মে সংরক্ষিত আছে। ১৩৪১ বঙ্গাব্দের ২৩ বৈশাখ সূর্যকুমার মোদকের মৃত্যু হয়।
চন্দননগরের এই মিষ্টির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবীতে। আম, স্ট্রাবেরি, চকোলেট নানান স্বাদের ও নানান আকারের জলভরা তৈরি হয় এখন। গরমকালে জলভরা সন্দেশের ভিতরে দেওয়া হয় গোলাপ জল। গোলাপ জল আসে কনৌজ থেকে। শীতকালে নলেন গুড় দেওয়া হয়।


মনোহরা জনাইয়ের সন্তান। মনোহরার বয়স দু’শো বছর। ব্রিটিশ আমলে কোনও এক সাহেব কলকাতা থেকে জনাই বেড়াতে যান এবং সেখানকার ময়রাদের হুকুম দেন এমন এক মিষ্টি তৈরি করো যা পাঁচ-সাত দিন রেখে দেওয়া যায়। সাহেবের আদেশ পালনে জনাইয়ের ময়রারা বুদ্ধি করে সন্দেশের উপর চিনির আস্তরণ লেপে দিয়ে বানিয়ে ফেলেন মনোহরা। দ্বিতীয় মতে, মনোহরার আবিস্কারক হলেন জনাইয়ের ষষ্ঠীতলা নিবাসী পরাণচন্দ্র নাগ। তৃতীয়ত, জনাইয়ের ময়রারা ভুলবশত সন্দেশকে চিনির রসে ডুবিয়ে তৈরি করে ফেলেন মনোহরা। চতুর্থ মতে, জনাইয়ের কোনও এক জমিদার শিকার যাওয়ার আগে ভিয়েনে নতুন মিঠাই তৈরি করার হুমুক দিয়ে গিয়েছিলেন। শিকার থেকে ফেরার আর নাম নেই। জমিদার মানুষের মেজাজ। উপায় না-পেয়ে নতুন মিঠাইকে চিনির রসে এক ডুব দেওয়ালেন ময়রারা। জন্ম হল মনোহরার। পঞ্চম মতে, জনাইয়ের জমিদার বাড়ির কেউ একজন বা খোদ জমিদার স্থানীয় এক ময়রাকে মিষ্টি তৈরির নির্দেশ দিয়ে কাজে বেড়িয়ে যান। মিষ্টি বানানো যখন মাঝপথে তখন তিনি ফিরে আসেন। তাই তড়িঘড়ি ময়রা ভদ্রলোক সন্দেশকে চিনির রসে চুবিয়ে পরিবেশন করেন। সেই সন্দেশ খেয়ে এতটাই প্রীত হন জমিদার যে, এর নাম রাখেন মনোহরা। ষষ্ঠ মতে, জনাইয়ের ললিত ময়রা উনিশ শতকের মাঝামাঝি মনোহরার উদ্ভাবন করেন।
মনোহরা হল ছানার সন্দেশ। যার উপরে থাকে চিনির আস্তরণ। ছানা, চিনিতে পাক করে এলাচ, জয়িত্রী, জায়ফল দিয়ে মাখা হয়। তারপর সন্দেশ পাকিয়ে মোটা রসে মুড়ে ফেলা হয়। এতেই সন্দেশের আয়ু বাড়ে।
বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে মেচার জন্ম। এ হলো মনোহরার তুতো ভাই। মেচা আর মনোহরা, দুই সন্দেশ বানানোর কৌশল এক। কেবল ভিতরের বস্তু আলাদা। আবার ছানার মুড়কির ক্ষেত্রেও একই কায়দা, চিনির প্রলেপে মিষ্টি ঢেকে দেওয়া। হুগলির সাদা বোঁদেও তাই। উত্তরের রসকদম সেটিরও বাইরে দানা পাকানো চিনির আস্তরণ দেওয়া হয়। প্রতিটির আদত উদ্দেশ্য একটাই, মিষ্টিকে বেশিদিন টিকিয়ে রাখা।
মেচা-কে প্রাক ছানার মিষ্টির যুগের মিষ্টি বলেই মনে হয়। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজের দেওয়ান, রাজাদের তুষ্ট করে বেলিয়াতোড়ের জমিদারি লাভ করেন। সময়টা ছিল ১৬২৫-৩৫ সালের মধ্যে। সেই সময় লাড্ডু জাতীয় মিষ্টি তৈরি হত বেলিয়াতোড়ে, হয়তো সেটাই ছিল মেচার আদিপুরুষ। ভুললে চলবে না, বাঁকুড়ার এক পাশে মেচা যখন তৈরি হচ্ছে, তখন জেলার আর এক প্রান্ত, বিষ্ণুপুরে পিয়াল ফলের বীজ থেকে মোতিচুর তৈরি হচ্ছে। সেও কিন্তু বেসন থেকে তৈরি হওয়া মিষ্টি।


মেচা বিক্রেতাদের মতে, মেচার বয়স দু’শোর উপর। অন্য একটি মত অনুযায়ী, জনৈক মিষ্টান্ন বিক্রেতা গিরিশচন্দ্র দাস মোদক মেচার উদ্ভাবক। বর্ষায় ধর্মরাজের গাজন উপলক্ষ্যে মেলা বসত। এই মেলায় গুড়ের লাড্ডু বিক্রি করতেন গিরিশচন্দ্র কিন্তু বর্ষায় গুড়ের মিষ্টি নষ্ট হয়ে যেত। এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়েই জন্ম হয় মেচার জন্ম। মেচা মহল দোকানের কর্ণধার ভগবান দাস মোদকের কাছে শুনেছি, উল্টোরথের পরের পূর্ণিমায় ধর্মরাজের গাজন হয়। আষাঢ়, শ্রাবণ মাসে গাজন হয়। গাজন উপলক্ষ্যে গুড়ের লাড্ডুর প্রচলন ছিল। বর্ষায় সেটা গলে যেত। পরিত্রাণে উপায় হিসাবেই ডালের বেসন থেকে মেচার জন্ম।
বুটের ডালের (ছোলা) বেসন থেকে গঠিয়া তৈরি করা হয়। তারপর সেটাকে গুঁড়ো করে চিনি, এলাচ গুঁড়ো, ছানা, ক্ষীর মিশিয়ে রেখে দেওয়া হয়। একদিন রেখে তারপর গোল্লা পাকানো হয় লাড্ডুর মতো। তারপর তা চিনির রসে ফেলে তুলে নেওয়া হয়। চিনির রস শুকিয়ে একটা আস্তরণ তৈরি হয় গোল্লার বাইরের দিকে। স্বাদ বাড়ানোর জন্য হালে ক্ষীর, কাজু, ছানা, পেস্তা এসব দেওয়া হচ্ছে। খুব সম্প্রতি নানান ফ্লেভারের ও নানান রঙের মেচা তৈরি হচ্ছে বেলিয়াতোড়ে। ধ্রুপদী মেচা তৈরি হত স্রেফ বুটের ডাল দিয়ে বানানো গঠিয়া গুঁড়ো আর চিনি দিয়ে। পাক দেওয়ার পর ঠান্ডা হলে ঘি দেওয়া হত। জঙ্গলমহলের পর্যটন মেচাকে গতি দিয়েছে।
বাংলার মিষ্টি জগৎবিখ্যাত। যে মিষ্টি বাংলার জল, হাওয়ায় জন্মায়; স্বাদে তার সঙ্গে এঁটে ওঠা মুশকিল। সন্দেশ, রসগোল্লা, ছানাবড়া, মিহিদানা-সীতাভোগ একের পর এক মিষ্টি ছিনিয়ে এনেছে ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’-র তকমা। তালিকায় নয়া সংযোজন জলভরা, মনোহরা, মেচা। ধীরে ধীরে বাংলার মিষ্টি বিশ্বজয় করছে।

