শিল্পী রেবা হোর : আপন আলোয় সদা উজ্জ্বল – সংহিতা রায়
২৩ মে থেকে ‘দেবভাষা বই ও শিল্পের আবাস-এ শুরু হয়েছে শিল্পী রেবা হোরের ‘জন্ম শতবার্ষিকী প্রদর্শনী’। শিল্পীর শতাধিক কাজ ছাড়াও দেখা যাচ্ছে তাঁর তিনটি স্কেচ খাতাও। প্রদর্শনী চলবে ১৬ জুলাই অবধি। ছুটির দিন ও রবিবার বাদে প্রতিদিন দুপুর ২টো থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
রেবা হোর ছিলেন আজীবন আড়ালের মানুষ। শিল্পীর শতবর্ষ শীর্ষক এই প্রদর্শনী তাঁর কাজ এবং জীবনে নতুন আলো।
কোবাল্ট ব্লু, সুরুলিয়ান ব্লু… কমলা, লাল… ফুটে আছে ফুলের মতো। তার প্রচন্ড প্যাশন…
সে-ই আমার মা। বাবার কাছে ‘রেবা’। প্রতিবেশীদের ‘দিদি’। কলাভবনের ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘রেবাদি’। আর আমার ‘মা’। আমার ঠিকানা। আমার আলো। ছায়া। ঘর।
মা রেবা হোরকে এভাবেই দেখেছেন কন্যা চন্দনা হোর।
রেবা হোর পছন্দ করতেন আড়ালের জীবন। শিল্পীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া উচ্চকিত আলোর পরিবর্তে তিনি যেন ঘরের কুলুঙ্গীতে রাখা শান্ত নির্জন প্রদীপ।
যার অচঞ্চল শিখা ভরিয়ে দেয় ঘর। মানুষটির মতোই রেবা হোরের ছবির দুনিয়াও থেকে গিয়েছে আড়ালেই।
প্রথম বাঙালি হিসাবে পেয়েছিলেন ললিত কলার জাতীয় পুরস্কার। কলাভবনের বিখ্যাত শিক্ষিকা তিনি। জীবনসঙ্গীর নাম ‘শিল্পী সোমনাথ হোর’ হলেও রেবা হোর আপন আলোয় সদা উজ্জ্বল।
১৯২৬ সালের ৭ মে কলকাতায় তাঁর জন্ম। বাবা কুলদারঞ্জন দাশগুপ্ত ছিলেন জেলা জজ। পরে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হন। মা সুপ্রভা।
রেবা দাশগুপ্তর পড়াশোনা বাড়িতেই। গৃহশিক্ষক হিসাবে একদিকে মা আর এক দিকে বাবা। মায়ের কাছে ভাষা, সাহিত্যের পাঠ চলত। বাবার কাছে ইংরেজি আর সংস্কৃত ক্লাসিকস। সঙ্গে অঙ্ক। রেবার কিন্তু একদম ভাল লাগত না অঙ্ক, অঙ্কের খাতা ভর্তি করে ছবি এঁকে রাখতেন।
পরে মায়ের উৎসাহে শিল্পী প্রমোদকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছে আঁকা শিখতে শুরু করেন।
একসময় কাজের সূত্রে বাবা বদলি হয়ে গেলেন রাজশাহীতে। ফলে প্রমোদ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে আঁকা শেখার দিন তাঁর ফুরল। কিন্তু বৃথা গেল না সেই পাঠ। যা দেখতেন তাই আঁকতেন নিজস্ব ঢঙে। মানুষ, জলে ভেজা পাখির ছানা, কুকুর, বেড়াল, হাঁস আর তাদের জীবন সংগ্রাম।
১৩ বছর বয়সে রেবার প্রথম বিদেশ যাত্রা। সপরিবারে। দীর্ঘ প্রবাসজীবন প্রভাব ফেলেছিল সদ্য কিশোরীর মনে। বিদেশের দিনগুলোয় শিখে নিয়েছিলেন উদার পৃথিবীর ভাষা।
দেশে ফিরে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পাশ করলেন। এদিকে চারপাশ অস্থির। জাতীয় আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গায় টালমাটাল দেশ। রেবার বাড়িতেও বাবা-মা উদাসীন থাকেননি সেই ঢেউয়ের স্পর্শ থেকে। রেবা তখন কলেজ ছাত্রী। সমকালকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন একেবারে সামনে থেকে। এসবের মধ্যেই ভর্তি হলেন আর্ট কলেজে।
আর্ট কলেজের ছাত্রী হিসাবে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেন। স্বাধীনতার পরের বছর পেলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ। ১৯৫৪-তে শিল্পী সোমনাথ হোরের সঙ্গে বিয়ে। ‘রেবা দাশগুপ্ত’ হলেন ‘রেবা হোর’।
পার্ক সার্কাসের ছোট্ট দু’কামরার বাসায় যৌথ জীবনের শুরু। সেই বছরই চৌরঙ্গী টেরেসে তাঁদের যৌথ প্রদর্শনী হয়।
তার আগেই অবশ্য কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৫১-তে ডায়োসেশন স্কুলে শিল্প শিক্ষিকা হিসাবে।
তাঁর জীবনে তিন পর্ব। কলকাতা-দিল্লি আর শান্তিনিকেতন। প্রথম পর্ব কলকাতায়, দ্বিতীয় পর্ব দিল্লিতে, সেখানেই কন্যা চন্দনার জন্ম। জীবনের শেষ পর্বে থিতু হয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে।
তেল রং, জল রং, প্যাস্টেল, টেরাকোটা মাধ্যমে কাজ করেছেন। রং রেখার জীবনে আত্ম আবিষ্কারই ছিল তাঁর সাধনার পথ। ছবিতে মনের গহনতল, একাকিত্ব যেমন এসেছে তেমন এসেছে সমাজ, মানুষ, যৌথ যাপনের সংগ্রাম। সময়ের অস্থিরতা, বিচ্যুতি তাঁকে ধাক্কা দিলেও আশাবাদী থেকেছেন শেষ পর্যন্ত।
সারা জীবন গভীর সংবেদনশীল হৃদয় নিয়ে দেখেছেন সমাজ-সংসার। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন রোজকার যাপনে। অতিসাধারণ জীবন যাপন করতেন। গুরুত্ব দিতেন
সকলকে নিয়ে কালেকটিভ বেঁচে থাকায়। সেই বিশ্বাস থেকে সরেননি কখনও।
২০০৮ সালে প্রয়াত হন শিল্পী।
[ছবি : দেবভাষার প্রদর্শনী থেকে
শিল্পী সোমনাথ হোর এবং রেবা হরের ছবি ইন্টারনেট / গুগল থেকে গৃহীত]














