“ম্যায় ওয়াপস আয়ুঙ্গা : দেশ, কাল, সময় বদলায়, শুধু বদলাতে পারে না কিনু আর জিয়া… ” – সংহিতা রায়
“আমি যাব না
যা করবে করো
আমি কি বলেছিলাম ভাগ করতে?”
সাইকেল রেখে মাটিতে বসে পড়ে কিনু। তার উল্টোদিকের মানুষগুলো একদিন আগেও প্রতিবেশী ছিল। এখন প্রতিপক্ষ।
এক রেখার টানে রাতারাতি প্রতিবেশী বদলে গিয়েছে প্রতিপক্ষে। বদলে গিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য। নিজের ভিটে, নিজের মাটি সব পর হয়ে এখন- ওপার। মাঝখানে কাঁটাতার।
ৱ্যাডক্লিফ লাইন। দেশ ভাঙার করাল রেখা। সেখানে বসে থাকে কিনু।
কাঁটাতারের বিভেদ বোঝেনা ছোট্ট শিশু। কোনদিক ভারত কোন দিক বা পাকিস্তান। বার্ধক্য দ্বিতীয় শৈশব। এই দ্বিতীয় শৈশবে পা রেখে সীমান্ত বোধ হারিয়ে ফেলেছিলেন ৯৫ বছরের বৃদ্ধ ঈশ্বর সিং গ্রেওয়াল। ওরফে কিনু।
তাঁর সময় আটকে ১৯৪৭-এ। বারবার ফিরে যেতে চান সরগোধায়।। যা আজ পাকিস্তানের অংশ।
ডিমেনশিয়ায় ডুবে যেতে থাকেন সর্দারজী। তাঁর ভাঙা কথা, ঝাপসা স্মৃতির অবগাহন পরিবারের কাছে প্রলাপ মনে হয়। চেনা গলি, মহল্লা, কলেজের করিডর, ক্রিকেট, ক্যামেরা, খেলার সাথী ফিরে আসে। তাঁর সেই আপাত অসংলগ্ন কথায় নির্মম সময়ের দলিল আবিষ্কার করে তাঁর নাতি নির্ভর। ৭৮ বছর ধরে এক নারীকে আগলে রেখেছেন সর্দারজী।
নিজের হাতে খোদাই করে রাখে তার নাম। ‘মালেকা দিলফরেব’। স্বপ্নের ভিতর ফিরে ফিরে আসে সেই নারী। এক কান তার খালি। ঝুমকো খানা হারিয়ে গিয়েছে ভাঙা কোঠার বাগিচায়। এক কানে ঝুমকো নিয়ে সে অপেক্ষা করে… করতেই থাকে… কিনুর জন্য …
সর্দারজীর বুকে কিনু আর জিয়ার গল্প। আর পরিবারের অভিশপ্ত কাহিনি।
শিখ কিনু আর মুসলিম জিয়ার প্রেম আটকে যায় ধর্ম আর টুকরো হওয়ার দেশের কাঁটাতারের গন্ডিতে। ১৯৪৭-এর ১৪অগাস্ট ওলোটপালোট করে দেয় তাদের জীবন।
নেতাদের আলোচনায় স্থির হয়েছিল দেশের ভাগ্য। তাঁরা রাজি হয়েছিলেন খণ্ডিত দেশের স্বাধীনতায়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত হাজার হাজার পরিবারের জন্য এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল।
পিতৃপুরুষের ভিটে রাতারাতি হয়ে গিয়েছিল পরের দেশ। ব্যাপক গণহত্যা ও লুটপাট আর মানবতার অবক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন হয়েছিল দেশ।
আর পঞ্জাব ও বাংলার হতভাগ্য পরিবারগুলো তাদের পৈতৃক সম্পত্তি ত্যাগ করে সীমান্ত পার হয়ে শরণার্থী হিসেবে শুরু করেছিল নতুন জীবন।
উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে বহু মুসলিম পরিবার করাচিতে মুহাজির হিসেবে এসে পৌঁছায়। সিন্ধুর হিন্দুরা গুজরাট ও বোম্বেতে এসে পৌঁছায়।
ভারত বিভাজন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা ছিল। কতজন মারা গিয়েছিলেন বা ঘরবাড়ি হারিয়েছিলেন তার কোনো সঠিক হিসাব না থাকলেও, অনুমান করা হয় যে এই বিভাজনের ফলে সম্ভবত ২ কোটি পর্যন্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন এবং ২ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষের মধ্যে মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
ঈশ্বর সিং গ্রেওয়ালের কাছে দেশভাগ মানে প্রেমিকা জিয়াকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি।
১৪ অগাস্ট দেশ ভাগের দাঙ্গায় তখন পুড়ছে পঞ্জাব। রক্তে, আগুনে, কান্নায় ভেসে যায় কিনু-জিয়ার স্বপ্ন আর ভবিষৎ। হয় মৃত্যু নয়, উদ্বাস্তু জীবন। মাঝখান বলে কিছু হয় না। ট্রেন ছুটে যায় হিন্দুস্তানের দিকে কিনুর ঘর পড়ে থাকে ওধারে, সরগোধায়, পাকিস্তানে। ঘরের মানুষ, মাটি, বন্ধু, প্রেমিকা…
কিনু ফিরতে চেয়েও ফিরতে পারে না। বারবার সে আটকে যায়। তার বেদনা এক হয়ে যায় হাজার হাজার ঘরহারা উদ্বাস্তু মানুষের সঙ্গে।
পরদেশে জান বাঁচে, কিন্তু সে মাটি কখনও আপন হয় না। গায়ে যে বসে যায় রিফুউজির ছাপ। তাই নিজেকে বজ্রকঠিন করে তোলে কিনু। তার মন নেই। প্রেম নেই। স্নেহ নেই। পিছু ফিরে তাকাতেও চায় না। তবু লুকানো ইস্তাহারের মতো মধ্যরাতে কবিতা লেখে। অক্ষর দিয়ে ছুঁতে চায় ভালবাসা। হায় তার ফেলে আসা দিন! সরধা শহরের পথ, মাঠঘাট পেরিয়ে সোনালী গমের ক্ষেতে দৌড়তে থাকে স্বপ্নের সাইকেল।
দেশ, কাল, সময় বদলায়, শুধু বদলাতে পারে না কিনু আর জিয়া…
৫৫তম জন্মদিনের ঠিক আগেই ১২ জুন মুক্তি পেয়েছে ইমতিয়াজ আলীর সাম্প্রতিক ছবি ‘ম্যায় ওয়াপস আয়ুঙ্গা’। নাসিরুদ্দিন শাহ, দলজিৎ সিং, বেদাঙ্গ রায়না, শর্বরী ওয়াঘ অভিনীত এই ছবি তাঁর কাছে জন্মদিনের সেরা উপহার।
অতিরাষ্ট্রবাদী বলিউড ছবি দ্বারা বিকৃত ইতিহাস আর ঘৃণা ছড়ানো যখন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন ইমতিয়াজ একেবারে বিপরীত পথে হেঁটেছেন। দেশভাগের আধারে নির্মিত ছবিকে তিনি উস্কানির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেননি। বরং উপমহাদেশের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিকে তুলে ধরেছেন আশ্চর্য ভালবাসার রূপকথা হিসাবে। যাকে দেশকালের সীমারেখায় বাধা যায় না। গোটা পৃথিবীর ঘরহারা মানুষের গল্প হয়ে উঠেছে এই ছবি। দাঙ্গার ভয়াবহতা, অনার কিলিং, ধর্ষণ, গণহত্যা-সবই এসেছে ছবিতে কিন্তু কখনই তা কোনও একটি সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে তাদের খলনায়ক বানাননি।
ঈশ্বর সিং গ্রেওয়ালের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নাসিরুদ্দিন শাহ। তিনি এ ছবির প্রাণ। তরুণ ‘কিনু’ বেদাঙ্গ রায়না। জিয়ার চরিত্রে রয়েছেন শর্বরী ওয়াঘ। অতীত-বর্তমান-বাস্তব আর বিভ্রমের মধ্যে অনায়াস যাতায়াত করেছে ছবি। তুখোড় সম্পাদনার জন্য বিশেষ প্রশংসা প্রাপ্য সম্পাদক আরতি বাজাজের। সিনেমাট্রোগ্রাফিতেও ইমতিয়াজের নিজস্ব স্টাইল অটুট। দর্শকের চোখের আরাম। কিনু-জিয়ার প্রেমকে সাররিয়েল অনুভূতি দিয়েছেন এ. আর রহমান।
ছবির বিচ্যুতি আছেই। কিন্তু চূড়ান্ত অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে ইমতিয়াজের এই ছবি দর্শক কাঁদিয়েছে সৎ আবেগের কান্নায়। দেশভাগ যাঁদের জীবন বদলে দিয়েছে , সেই দিনের সাক্ষী যাঁরা তেমন বহু মানুষ এই ছবি দেখে প্রশংসায় ভরিয়েছেন পরিচালনককে। এই প্রজন্মের দর্শকরাও অনুভব করেছেন ছবির যন্ত্রণা।


