‘সংস অব ফরগটেন ট্রিজ'(নাগরিক ভিড়ে খুঁজে পাওয়া প্রবাসী মেয়েদের ইতিবৃত্ত) – সংহিতা রায়
শহরের একদিকে কোটিপতিদের বাস। অন্য দিকে পৃথিবী বিখ্যাত ধারাভি বস্তি। একদিকে অর্থবান অন্য দিকে দিন আনি দিন খাই পরিযায়ী ভিড়।
দুর্ঘটনা ছাড়া খবরের কাগজের হেডলাইনে তাদের নাম আসে না। মুখ চেনা যায় না। হাইওয়ের ধার, ফুটপাত, স্টেশন চত্বরে তারা মিশে থাকে। মায়া নগরীর অপ্রতিরোধ্য আত্মা।
যেমন থুয়া আর শ্বেতা। মুম্বই এসেছিল তারা জীবিকার প্রয়োজনে। থুয়া অভিনেত্রী হতে চায়। শ্বেতা আইটি সেলস এক্সিকিউটিভ। একই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা তারা।
প্রথম প্রথম দুজনেরই দুজনকে তেমন পছন্দ ছিল না। তবু কিচেন , বাথরুম, বেডরুমের দেওয়াল পেরিয়ে একে অপরের জীবনে ঢুকে পড়ে তারা। বন্ধুত্ব হয় তাদের। গড়ে ওঠে নির্ভরতা।
অনুপূর্ণা রায় যাকে বলেছেন ‘প্লেটোনিক লাভ ‘। ছবির নাম ‘সংস অফ ফরগটেন ট্রি ‘। তিনি এই ছবির পরিচালক। থুয়ার ভূমিকায় নাজ শেখ। শ্বেতা সুমি বহেল।
সম্প্রতি কলকাতায় হল ছবির প্রিমিয়ার।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ.ই.টি.এস.ইউ. (ফেটসু)র আয়োজনে ছায়ানট চলচ্চিত্র ও নাট্য উৎসবে দেখানো হয় ছবিটি।
২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে অনুরাগ কাশ্যপের উপস্থাপনায় ‘দ্য সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ প্রকাশিত হয় বিরাশিতম ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। সেরা পরিচালকের শিরোপা জিতে নেন তিনি।
অনুপূর্ণার জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা পুরুলিয়ায়। তিনি কুলটি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তনী। পরে গণমাধ্যম।
দিল্লির এক কল সেন্টারে চাকরি করতেন। তারপর আসেন মুম্বই। বারবার শহর বদল করলেও বদল ঘটেনি সিনেমা বানানোর ইচ্ছেতে।
ছবি বানানোর প্রথাগত শিক্ষা তাঁর নেই। পুরুলিয়ায় বাড়ি থেকে সিনেমা হল অনেক দূরে। তাই ইচ্ছে করলেই হুট করে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সুযোগ তাঁর ছিল না। দেশি, বিদেশী সিনেমার পাইরেটেড সিডি জোগাড় করে নিজের ল্যাপটপে দেখতেন।
এই ছবির দুই মূল চরিত্র থুয়া আর শ্বেতা। তারা দুজনেরই পরিযায়ী। তারা মিলেমিশে রাঁধে। এক সঙ্গে খায়। ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশি হয়ে ভাগ করে নেয় এক চিলতে বাসা।
বড় শহরের ছোট, বড় ঢেউ ধাক্কা দেয় তাদের। থুয়ার কাছে সমুদ্রের খোঁজ জানতে চায় শ্বেতা। সে জানতে চায় এই শহরকে। থুয়ার মনে পড়ে নিজের গ্রাম, ছোটবেলা, স্কুলের প্ৰিয় বন্ধু ঝুমার কথা।
এই ছবি অনুপূর্ণার রক্ত ঘামের ফসল। অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন। খরচ জোগাড় করতে একসঙ্গে একাধিক চাকরিও করতে হয়েছে। ছবি বানিয়েছেন বন্ধুদের নিয়ে। এক সঙ্গে থেকে, খেয়ে দল বেঁধে কাজ।
দেবজিৎ সামন্তর ক্যামেরা ঘুরেছে থুয়া শ্বেতার ঘরের আনাচে কানাচে। সযত্নে জন্ম নিয়েছে এক অচেনা মেয়েমহল।
থুয়া-শ্বেতার গল্পে নারীর সঙ্গে নারীর বন্ধুত্ব আর সম্পর্কের নানা স্তর ছুঁতে চেয়েছেন পরিচালক। তাতে ভাব-ভালবাসা-মন কষাকষি আবার নিবিড় মানবী চেতনার আবিষ্কার রয়েছে। মেস বাড়িতে কীভাবে ঘর ভাগাভাগি করে থাকে মেয়েরা? কোন বুনিয়াদে গড়ে ওঠে গোষ্ঠীবোধ। উত্তর খোঁজে এই ছবি।
২০২২ সালে অনুপূর্ণা চাকরি নিয়ে মুম্বই আসেন। তাঁর দিন যাপনের গল্প মিশেছে ছবিতে।
এই ছবির শুটিং হয়েছিল অনুপূর্ণার ফ্ল্যাটে। সোসাইটির লোকজন কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই ভাল চোখে দেখেনি। সেই ঘটনা মিলে গিয়েছে থুয়ার জীবনে। সে অভিনয়ের সুযোগ খুঁজলেও পেট চালাতে যৌনকর্মীর কাজ করতে হয়। ওই ফ্ল্যাটেই আসে তার ক্লায়েন্টরা। এমনকি ফ্ল্যাটের মালিকও তার ক্লায়েন্ট। এমন মেয়ে আবাসনে থাকায় তাঁদের প্রবল আপত্তি। সতর্কও করা হয় তাকে।
থুয়া আর শ্বেতা নতুন করে আবিষ্কার করে নিজেদের। নিজেদের মতো একটা আকাশও খুঁজে পায়। হয়ে ওঠে আরও বহু প্রবাসী নারীর মুখ। দেশের যে কোনও মেট্রো শহরে নাগরিক ভিড়ে তাদেরকে আপনি খুঁজে পাবেন বারবার…





