জন্মাষ্টমীঃ বাঙালির তাল দিবস – সৌভিক রায়

তাল দিতে বাঙালি কিন্তু ওস্তাদ! খোদ মহানায়ক বলে গিয়েছেন, বেতাল হলেই আসর মাটি। আহা! ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবিতে উত্তমকুমারের ঠোঁটে মান্না দে-র গানখানা মনে নেই, ‘‘কাহারবা নয় দাদরা বাজাও উল্টো পাল্টা মারছ চাঁটি/ শশীকান্ত তুমিই দেখছি আসরটাকে করবে মাটি।’’ সে শিক্ষা অক্ষরে অক্ষরে মনে রেখেছে বাঙালি। সোশ্যাল দেওয়ালে খাপ বসেছে? তাল নিয়ে উপস্থিত বং-বাহিনী। অফিস পলিটিক্স, সহকর্মীর বিরুদ্ধে জট পাকানো হচ্ছে, দিয়ে দিল তাল। পরিবারের কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে ‘পিএনপিসি’ চলছে তাল দিতে দেরি নেই। পাড়া-প্রতিবেশীদের কূটকচালি তাল দিতে উজিয়ে হাজির বাঙালি…রসবোধের মতো বাঙালির তাল জ্ঞানও সাঙ্ঘাতিক। এহেন জাতি তাল খেতে পছন্দ করবে না? তা হয় না-কি! যেমন নবমী মানে মাংসের লাল ঝোল, যিশুর জন্মদিন মানে কেক; তেমনই শ্রীকৃষ্ণের ‘বার্থ ডে’ মানেই তাল দিবস। তালের বড়া খাওয়ার দিন।
এক্কালে এই দিনটাতে বাড়ির মেয়ে-বৌদের হাল তাল ঘষে ঘষে বেহাল হয়ে যেত। তালের মইতে তাল-আঁটি ফেলে ধোপা বাড়ির কাপড় কাচার মতো কসরৎ করতে হতো যে…একালেও তাই হয়। মিক্সার-গ্রাইন্ডার নামক বস্তুটি কিন্তু তালের হাল বেহাল করতে ডাহা ফেল! কারণ, তালের জাঁদরেল আঁশ। ফলে আজও তালের বড়া খেতে গেলে ঘষতে হবে…তাল। যদিও বোতলবন্দি তাল গোলার আগমন ঘটেছে আজকাল।
বিভূতিভূষণ আর রবি ঠাকুর, গপ্পো আর কবিতা দিয়ে তালকে একেবারে বাঙালির মনে গেঁথে দিয়েছেন। তাল গাছ সকলে ছাড়িয়ে মাথা তুলে দাঁড়ায়, জীবনে তাল গাছ না-দেখা লোকের মনেও তাল গাছের ছবি এঁকে দিয়েছেন রবি ঠাকুর। আবার নজরুলের কবিতায় রয়েছে তালপুকুরের কথা। বিভূতিভূষণের তালনবমী দুঃখ, বিষাদের এক মরমী কাহিনি–
দরজার কাছে গিয়ে নেপাল আবার পেছন ফিরে জিগ্যেস করলে, “তাল নেবেন তাহলে?”
“তাল? তা দিয়ে যেয়ো বাবা। ক-টা করে পয়সায়?” “দুটো করে দিচ্ছি পিসিমা। তা নেবেন আপনি, তিনটে করেই নেবেন।”
“বেশ কালো হেঁড়ে তাল তো? আমাদের তালের পিঠে হবে তালনবমীর দিন–ভালো তাল চাই।”
“মিশকালো তাল পাবেন। দেখে নেবেন আপনি।”
গোপাল বাইরে এসেই দাদাকে বললে, “কবে তাল দিবি দাদা?”
“কাল।”
“তুই ওদের কাছে পয়সা নিসনে দাদা।”
নেপাল আশ্চর্য হয়ে বললে, “কেন রে?”
“তাহলে আমাদের নেমন্তন্ন করবে, দেখিস এখন।”
“দূর, তা হয় না! আমি কষ্ট করে তাল কুড়ব—আর পয়সা নেব না?”
রাত্রে বৃষ্টি নামে। হু হু বাদলার হাওয়া সেই সঙ্গে। পুবদিকের জানলার কপাট দড়িবাঁধা; হাওয়ায় দড়ি ছিড়ে সারারাত খট খট শব্দ করে ঝড়বৃষ্টির দিনে। গোপালের ঘুম হয় না, তার যেন ভয়ভয় করে। সে শুয়ে শুয়ে ভাবচে—দাদা তাল যদি বিক্রি করে, তবে ওরা আর নেমন্তন্ন করবে না! তা কখনো করে? (তালনবমী- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)
বোরোলিন, আলু আর রসগোল্লার পর বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হলো তাল। প্রবাদপ্রবচনে তালের ছড়াছড়ি। তাল দিয়ে কত স্থাননাম আছে, তালদি, তালতলা। তালের নামে সন্দেশও গড়েছে বাঙালি, তালশাঁস। তালের জন্য তিথিও রয়েছে, তালনবমী। দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরি পেটে পড়েনি এমন বাঙালি মেলা দায়। আমতা হোক বা আমস্টার্ডাম যেখানে বাঙালি আছে, তার পাকস্থলীতে দুলালের তালমিছরি আছেই আছে। বসন্তে দেখা মেলে সাদা ধবধবে চাক চাক তাল পাটালি। গরমে তালপাতার পাখা, ছেলেভুলোন খেলনা তালপাতার সেপাই। ব্যাটারি নেই, মেশিন নেই কিন্তু কী সুন্দর নড়ে-চড়ে! বর্ষায় গাঁ-পাড়াগাঁয়ে তাল গাছের নৌকো…তালের ডুগ্গি। তাল গাছে আবার তেঁনাদের বাস, এমন একটা বিশ্বাস অনেকেরই আছে। তাল, এত আপন হলে হবে কী? বাড়িতে তাল গাছকে ঠাঁই দেয় না বাঙালি। বংশ নাশের ভয়। কথায় বলে, ‘তাল তেঁতুল কূল/ তিনে বংশ করে নির্মূল।’
বাঙালি আদতে তিন সময়ে তাল খায়, গরমে খায় তালশাঁস। তখন তাল কচি থাকে। ভিতরে সাদা শাঁস, তুলতুলে নরম, মিষ্টি। গরমকালে হাটে-বাজারে তালশাঁস কে না খেয়েছে! বর্ষায় খায় তালজাত নানা মিষ্টি। জন্মাষ্টমী তো তালের দিন, তালের ক্ষীর, তালের বড়া, তালের পীঠে, তালের লুচি, সবতেই তাল। আবার ভাদ্র মাসের কৌশিকী অমাবস্যায় তাল খাওয়ার রেওয়াজ আছে। লোকবিশ্বাসে বলে, তাল গোলা থেকে কাঁচা তাল মুখে দিলে দোষ কাটে। তাল থেকে পিঠে তৈরিতে বাঁকুড়ার বেশ সুনাম আছে। গ্রাম-গঞ্জে এখনও আমসত্ত্বর মতো তালসত্ত্ব দেওয়ার রীতি আছে।
আশ্বিনে খাওয়া হয় তাল ফোঁপরা। ভাদ্রে পাকা তালের রস নিংড়ে, ক্বাথ সংগ্রহ করে বানানো হয় বড়া। গড়াগড়ি যাওয়া আঁটি থেকে ফোঁপরা জন্ম। গ্রাম-গঞ্জে বর্ষাকালে থরে থরে সাজানো বিবর্ণ তালআঁটির দেখা মেলে। আঁটিগুলো মাটিতে রাখতে হয়। বর্ষায় জল পড়ে আঁটি থেকে অঙ্কুর বের হয়। অঙ্কুর মাটিতে প্রবেশের আগে তা তুলে নিতে হয়। তারপর আশ্বিন-কার্তিক মাসে তা তুলে ভাঙলে বা কাটলে দেখা যায় ভিতরে তৈরি হয়েছে নারকেলের শাঁসের মতো সাদা বস্তু। ওটাই তালের ফোঁপরা বা তাল ফোঁপর। কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোয় তালের ফোঁপরা দেওয়া হয়। নারকেল ফোঁপরা মতোই কেউ কেউ ফল হিসেবে তাল ফোঁপরা কাঁচা কাঁচা খান আবার অনেকে বেসন-চালের গুঁড়ো-নুন-মিষ্টি মাখিয়ে ভেজেও খান। কোথাও এর নাম তালকলম। কোথাও বা তালকরম। তালআঁটি-ও বলেন কেউ কেউ। এটিই শরৎকালে দেবভোগ্য হয়ে ওঠে।
ভাদ্দর মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী এলেই মন তাল তাল বলে ওঠে। মা-ঠাকুমারা তাল-সুজি-চিনির মিশ্রণ থেকে তাল ফুলুরি ভাজেন, ঈশ্বরকে তা নিবেদন করা হয়। ছেলেপুলেরা গরম গরম দু’টো-একটা বড়া খাওয়ার বায়না জোড়ে। এক বাটি তালের বড়া হয়ে ওঠে ‘কমিউনিটি ফুড’। আসরে হাত চলতে থাকে, ধীরে ধীরে বাটি খালি হয়। মন খুশ হয়। পরদিন খোঁজ পড়ে, ‘বাসি তালের বড়া খান কতক আছে নাকি?’ জিয়া নস্টালে চেপে সামান্য তালের বড়া হয়ে ওঠে ডাউন মেমোরি লেনের পথ…আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে বাঙালিয়ানাকে।
