পঞ্চম বর্ষ – প্রথম সংখ্যা – প্রবন্ধ
কবির গদ্য- সুকান্ত ভট্টাচার্য
বিভাস ভট্টাচার্য
সুকান্ত ভটাচার্যর (১৯২৬–১৯৪৭) সম্বন্ধে কিছু বলতে গেলেই মনে আসে ইংরেজি ভাষার দুই অকালপ্রয়াত কবি— জন কিট্স (১৭৯৫–১৮২১) এবং টমাস চ্যাটার্টন-এর (১৭৫২–১৭৭০) কথা! ব্যক্তিজীবনে কিট্স-এর মতোই কৈশোরে মাতৃহারা হয়েছিলেন সুকান্ত, আর তাঁর মতোই সদ্য কুড়ি-পেরোনো যৌবনে অমোঘ রাজরোগের আক্রমণে ছেড়ে যেতে হয়েছিল নিজস্ব কবিতার ভুবন— এই মর্ত্য-পৃথিবীকে নবজাত ‘শিশুর বাসযোগ্য করে’ যাবার ‘দৃঢ় অঙ্গীকার’ অসমাপ্ত রেখেই! অন্যদিকে মাত্র আঠারো বছর বয়সে আত্মঘাতী চ্যাটার্টন-এর মতোই স্ফুরণোন্মুখ প্রতিভার প্রতিশ্রুতি জাগিয়ে বিদায় নেবার সময়ে নিজের একটি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থও চোখে দেখে যাবার সুযোগ হয়নি তাঁর (‘ছাড়পত্র’ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর অকালমৃত্যুর কিছু পরেই)! জীবৎকালে ব্যাপক কবিখ্যাতি অর্জনের সৌভাগ্যও এই দুই তরুণ কবির হয়নি; যা কিছু যশ-খ্যাতি— জুটেছিল মৃত্যুর পরেই! উত্তরকালে কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও গদ্য রচনায় সুকান্তর সাধনা ও সিদ্ধির বিষয়টি প্রায় অনালোচিতই থেকে গেছে। যেটুকু আলোচনা হয়েছে, তা তাঁর পত্রগুচ্ছকে নিয়েই।১ কিট্স এবং চ্যাটার্টন-এর ক্ষেত্রে অবশ্য তাঁদের বিপুল কবিখ্যাতির আড়ালে তাঁদের চিঠিপত্র ও অন্য গদ্যরচনা নিয়েও উৎসুক পাঠক-সমালোচকের আগ্রহ একেবারে ঢাকা পড়ে যায়নি! সংক্ষিপ্ত জীবনের অতি সংক্ষিপ্ত লিখনপর্বে, সুকান্ত অজস্র কবিতা লেখার অবকাশ পাননি, গদ্য লেখার অবসর মিলেছে আরও কম! তবু তাঁর চিঠিপত্র, শিশু-কিশোর সাহিত্য, গল্প, নাটিকা, প্রবন্ধ মিলিয়ে যে সামান্যসংখ্যক গদ্যরচনার নমুনা চোখের নাগালে আসে— তার মূল্যও খুব কম নয়। বিশেষ করে ব্যক্তি সুকান্তর জীবন ও দর্শন এবং তার সূত্র ধরে তাঁর সাহিত্যসৃজনের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রবণতার মূল্যায়নে এই গদ্যরচনাগুলি এক পরিপূরক ভূমিকা পালন করে! বর্তমান নিবন্ধের সীমিত পরিসরে এই প্রসঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত মাত্র করা সম্ভব হবে।
১৯৪২-এর জানুয়ারি মাসে বন্ধু অরুণাচল বসুকে লেখা এক চিঠি থেকে দেখতে পাচ্ছি যে, তখন সুকান্ত মন দিয়ে পড়ছিলেন তারাশঙ্কর ও প্রবোধকুমার সান্যালের উপন্যাস, মণীন্দ্রলাল বসুর গল্পসংকলন! অর্থাৎ কবিতা লেখার পাশাপাশি গদ্যরচনার ভিত্তিও তৈরি হচ্ছিল। ওই বছরেরই অক্টোবর মাসে লেখা অন্য এক চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে সম্মেলক প্রয়াসে একখানি উপন্যাস রচনার কথা। অরুণাচল ও অন্য দুজনের সঙ্গে সুকান্তরও যৌথভাবে লেখার কথা ‘চতুর্ভুজ’ নামের সেই উপন্যাস— যা কিনা শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত থেকে গেছিল! সুকান্তর একমাত্র গদ্যগ্রন্থ ‘হরতাল’ প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পরে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ওই গ্রন্থের অন্তর্গত গল্পগুলির রচনাকাল সম্বন্ধে কোনো তথ্যই সুকান্তর রচনাসংগ্রহের (তাঁরই পারিবারিক প্রকাশনা থেকে মুদ্রিত) প্রামাণ্য সংস্করণে২ লভ্য নয়! তবে ওই গ্রন্থে ‘লেজের কাহিনী’ শীর্ষক শিশুতোষ গল্পটি যে রুশ শিশুসাহিত্যিক ভি. বিয়াঙ্কি-র ‘টেইল্স্’ নামক রূপকথার অনুবাদ সে-কথা উল্লেখ করা হয়েছে! মূল রুশ গল্পটি চিত্রশোভিত গ্রন্থাকারে প্রথম বেরোয় ১৯৩৭-এ! কিশোর সুকান্তর বয়স তখন বারোর আশেপাশে। তিনি যে রুশ ভাষা জানতেন তেমন কোনো প্রমাণ নেই। অতএব ওই গল্পের কোনো (ইংরেজিতে?) ভাষান্তরিত রূপ থেকে এই বঙ্গীকরণ করা হয়েছিল এটা অনুমান করা যায়। সুতরাং সেটা ১৯৪০-এর কাছাকাছি বা পরবর্তী কোনো সময়। আবার ‘হরতাল’ নামের গল্প ও ‘দেবতার ভয়’ শীর্ষক নাটিকায় সদ্যসমাপ্ত যুদ্ধের (দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ: ১৯৩৯-১৯৪৫) প্রসঙ্গ আছে! আমরা লক্ষ করেছি ১৯৪২-এ সুকান্ত বারোয়ারি উপন্যাস লেখায় যুক্ত হচ্ছেন। গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত অন্যান্য গদ্য রচনাগুলি পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে প্রধানত ১৯৪৩-১৯৪৪-এর মধ্যে। সুতরাং একথা অনুমান করা অসংগত হবে না যে, ‘হরতাল’-এর লেখাগুলি মোটামুটি ওই ১৯৪২-১৯৪৫-এর সময়পর্বে রচিত; লেখক তখন সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ! এই গ্রন্থের অন্তর্গত কাহিনিগুলিও যেন তাই মূলত শিশু-কিশোরপাঠ্য।
‘হরতাল’-এর শিরোনাম-গল্পটি একটি রূপক কাহিনি! মালিকপক্ষের নির্যাতনের প্রতিবাদে শোষিত কর্মচারীদের হরতালের সংকল্পে আহূত এক সভায় মানুষ মজদুরের বদলে এসে হাজির রেলস্টেশনের ইঞ্জিন, রেল লাইন, সিগন্যাল আর টেলিগ্রাফের খুঁটিরা! শোষণের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে এই-যে হরতালের প্রয়োগ— এর মধ্যে নবীন লেখকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাসের ছায়াপাত দেখা যাচ্ছে; তবে এর সবটাই কিশোর পাঠকের উপযোগী কৌতুকের মোড়কে পরিবেশিত! কাহিনির শেষপর্বে দেখা যাচ্ছে, বাস্তব জীবনের মতোই, মালিকপক্ষের দালালদের হস্তক্ষেপে সেই সভা ভন্ডুল হয়ে গেল। আন্দোলনকারীদের জ্বালাময়ী বক্তৃতা ও দৃঢ় সংকল্পের এই পরিণতিতে যে-হাস্যরস উৎপন্ন হয় সেটুকু কিশোর-উপভোগ্য হলেও তার অন্তর্নিহিত শ্লেষটুকু পরিণতমনস্ক পাঠকের পক্ষেই অনুভব করা সম্ভব! এর পাশাপাশি রাখা যাক ‘মজুরদের ঝড়’ শীর্ষক কবিতার পঙ্ক্তি:২
এখন এই তো সময়— / কই? কোথায়? বেরিয়ে এসো ধর্মঘটভাঙা দালালরা;/ সেই সব দালালরা— / ছেলেদের চোখের মতো যাদের ভোল বদ্লায়, … (‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থ)!
অন্যদিকে এই গল্পের আদল ও পরিণতির দিকে মনোযোগ দিলে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ব্যাঘ্রাচার্য্য বৃহল্লাঙ্গুল’-এর কথা মনে পড়ে যায়, যদিও তার উদ্দীষ্ট ছিল বয়স্ক পাঠকগোষ্ঠী!
পূর্বোক্ত ‘লেজের কাহিনী’ মৌলিক রচনা নয়, তবে শিশুপাঠ্য কাহিনি হিসেবে এর অনুবাদ যথেষ্ট সাবলীল। সাধারণভাবে বিদেশি ভাষা থেকে বাংলাভাষায় ভাষান্তর করতে গিয়ে মূলানুগত্যের কারণে অনেক সময়ে প্রতিষ্ঠিত অনুবাদকের প্রকাশভঙ্গিতেও যে-আড়ষ্টতা এসে পড়ে, এই গল্পের ভাষা সেই ত্রুটি থেকে মুক্ত। অনুবাদকর্মে কিশোর বয়সেই সুকান্ত যে-কুশলতা দেখিয়েছেন, তাতে মনে হয়— দীর্ঘজীবী হলে এই ক্ষেত্রে হয়তো তাঁর আরও কিছু দেবার থাকত। ‘ষাঁড়-গাধা-ছাগলের কথা’ গল্পটিও ‘প্যারাব্ল’-ধর্মী এবং কিঞ্চিৎ রূপকাশ্রয়ী: বিশেষভাবে শিশু-কিশোর পাঠকের জন্যই লেখা! গল্পের শেষে তাই সংযোজিত হয়েছে নীতিবাক্য: “নিজের কাজের মীমাংসা করতে অন্যের কাছে কখনো যেতে নেই।” এই গল্পেও দেখা যাচ্ছে, এক মানুষ মালিকের তিন মনুষ্যেতর পোষ্য মালিকের অত্যাচারের প্রতিবাদে ‘পরামর্শ-সভা’ করে “একটা ‘সমিতি তৈরী করল। ঠিক হল, আবার যদি এইরকম [অত্যাচার] হয়, তাহলে তিনজনেই একসঙ্গে লোকটিকে আক্রমণ করবে।” অপেক্ষাকৃত বলশালী ষাঁড় আর গাধা মিলে সমিতির সম্পাদক নির্বাচন করল ছাগলটিকে! ঘটনাচক্রে এই গল্পের শেষেও এই সভা-সমিতির সংকল্প ভেস্তে গেল মালিকের বন্ধুর হস্তক্ষেপে! কিন্তু নীতিবাক্যে পৌঁছোনোর আগে গল্পের একটা শ্লেষাত্মক সমাপ্তি টেনেছেন সুকান্ত যা অনুভব করতে কমবয়সি পাঠকেরও অসুবিধা হবে না:২
… লোকটির হাতে প্রচণ্ড মার খেতে খেতে ফিরে এসে গাধা আর ষাঁড় আবার মাল বইতে আর ঘানি টানতে শুরু করল আগের মতোই। কেবল ছাগলটাই আর কখনো ফিরে এল না। কারণ অনেক মহাপুরুষের মতো ছাগলটারও একটু দাড়ি ছিল।
এই শেষ বাক্যের মধ্যে তথাকথিত মহাত্মাসুলভ বিজ্ঞতার প্রতি যে-শ্লেষের আভাস মেলে তা অন্যত্রও সুকান্তর কবিতায় দেখতে পাই:২
পণ্ডিত এবং বিজ্ঞজনের দেখলে মাথা নাড়া,/ ভাবি উপদেশের ষাঁড়ে করলে বুঝি তাড়া…” (‘অতি কিশোরের ছড়া’/ ‘মিঠেকড়া’)।
‘হরতাল’ গ্রন্থের অন্য দুটি রচনার মধ্যে একটি হল নাটিকা: ‘দেবতার ভয়’, অন্যটি হল রূপকথাধর্মী, গীতাশ্রয়ী কথিকা ‘রাখাল ছেলে’। দ্বিতীয়টিতে গদ্যকার সুকান্তর চেয়ে গীতিকার সুকান্তর দাবি বেশি এবং গদ্যাংশের নির্মিতিতেও নিছক আবেগপূর্ণ বিবৃতি ব্যতীত তেমন কোনো কারুকৌশল লক্ষণীয় নয়! ‘দেবতার ভয়’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পটভূমিকে তুলে ধরেছে কৌতুকের আড়ালে। সংলাপাশ্রয়ী কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে ‘অ্যাটম বোমা’-র। সামাজতান্ত্রিক দুনিয়ার প্রতি লেখকের নিজস্ব আস্থা প্রকাশ পেয়েছে নারদের মুখে বসানো সংলাপে: “সোভিয়েট রাশিয়া নাকি ওদের কাছে স্বর্গ, খাওয়াপরার কষ্ট নাকি কারুর সেখানে নেই। সবাই সেখানে সুখী।” মানুষের হাত থেকে দেবতাদের স্বর্গকে বাঁচানোর উপায় নির্দেশ করে ব্রহ্মার উক্তি:২ “ওদের [মানুষ] মধ্যে মারামারি, কাটাকাটিটা যদি বজায় রাখা যায় তা হলেই ওরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করে মারা পড়বে, আমরাও নিশ্চিন্ত হব।” মানুষের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বকে প্রশ্রয় দিয়ে (তথাকথিত divide and rule!) সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিকাশ ঘটানোর প্রবণতার প্রতি প্রচ্ছন্ন কটাক্ষ সম্ভবত মিশে রয়েছে এই নাটিকার সমাপ্তিতে!
সুকান্তর অগ্রন্থিত গদ্য রচনার মধ্যে ‘ক্ষুধা’, ‘দুর্বোধ্য’, ‘ভদ্রলোক’— এই গল্পগুলি নেহাত কিশোরবয়স্ক পাঠকের উদ্দেশে লেখা নয়। প্রথম দুটির প্রকাশ ১৯৪৩-এ (সুকান্তর বয়স তখন সতেরো), তৃতীয়টি ১৯৪৭-এ; সবগুলিই ‘অরণি’ পত্রিকায়। খিদে আর দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস কেমন করে নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের হৃদয়কে নিঃস্ব এবং প্রাণকে মূল্যহীন করে তোলে তার করুণ বর্ণনা রয়েছে ‘ক্ষুধা’ গল্পে। গল্পে যে-একটি নিরুচ্চার প্রেমকাহিনির আভাস দেওয়া হয়েছিল তাও বিশুষ্ক হয়ে যায় ‘ক্ষুধা’র গ্রাসে! কেন্দ্রীয় চরিত্র বিনয় ভাবতে থাকে:২ “ক্ষুধা শোক মানে না, প্রেম মানে না, মানে না পৃথিবীর যে-কোন বিপর্যয়, সে আদিম, সে অনশ্বর।” ‘দুর্বোধ্য’ গল্পেও সেই যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ! গল্পের প্লট সরল— দুর্ভিক্ষের আবহে এক বৃদ্ধ অন্ধ ভিক্ষুকের আত্মোপলব্ধির কাহিনি:২ “… এত লোক, প্রত্যেকেই তার মতো ক্ষুধার্ত, উপবাসখিন্ন?” দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের ভিড়ে কন্ঠ মিলিয়ে সেও চিৎকার করে প্রতিবাদ করে: “অন্ন-চাই”! ব্যক্তিগত পীড়ার থেকে সর্বজনীন পীড়নের অনুভূতিতে উত্তরণের মধ্য দিয়ে কাহিনি শেষ হয় কিন্তু কঠোর বাস্তবকে ডিঙিয়ে কোনো আশার আলো জ্বালবার প্রয়াস করেন না লেখক! ‘ভদ্রলোক’ গল্পে মামার বাড়ি থেকে বিতাড়িত, ব্যর্থ প্রেমিক সুরেন বাসের কন্ডাক্টরের পেশায় নিমজ্জিত, নিষ্পেষিত হতে হতে কখন যেন “সৌখিন ভদ্রসমাজ থেকে ঘা-খাওয়া ছোটোলোকের সমাজে” পৌঁছে যায়! দেখা যাচ্ছে, তাঁর প্রিয় যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষের মডেল থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের স্বপ্নভঙ্গের চিরন্তন কাহিনিই সুকান্ত পুনঃপুনঃ বলতে চান! হয়তো সাম্যবাদী রাজনৈতিক অভিলক্ষ্যই কাহিনিকার সুকান্তর অদৃশ্য ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে দাঁড়ায়! অগ্রন্থিত অন্য দুটি আখ্যান ‘দরদী কিশোর’ এবং ‘কিশোরের স্বপ্ন’ ‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকার কিশোর বিভাগের জন্য লেখা, ১৯৪৩-এ, এবং স্বভাবতই কিশোরপাঠ্য। প্রথম গল্পের কিশোর নায়ক শতদ্রু আর দ্বিতীয় গল্পের জয়দ্রথর কাহিনি যেন কিশোর সুকান্তরই রাজনৈতিক দীক্ষাপর্বের আত্ম-প্রক্ষেপণ! দুই গল্পের প্রেক্ষাপটেই যুদ্ধোত্তর বাংলার ধ্বস্ত ছবি! কিশোর-স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সহায়তায় সংবেদী শতদ্রু প্রতিরোধ গড়ে তোলে মজুতদারির বিরুদ্ধে। আর ‘রিলিফ কিচেন’-এর কর্মী জয়দ্রথ ‘বাংলার কিশোর আন্দোলন’-এর কথা পড়তে পড়তে স্বপ্নাচ্ছন্ন হয়ে দেখতে পায় বাংলা-মায়ের ক্লিষ্ট অবয়ব! মজুর আর কিষানের পাশে এসে দাঁড়াতে তাকে ডাক দেয় বাংলা, তার দেশমাতৃকা; বলে: “শত্রুকে ক্ষমা ক’রো না… তা হলে আমি বাঁচবো না।” স্পষ্টত এই দুই গল্প কিশোর পাঠকের জন্য ব্যক্তি সুকান্তর সাম্যবাদী, সমাজতান্ত্রিক চেতনার পক্ষ থেকে উদাত্ত আহ্বান!
সুকান্তর একমাত্র ‘নন-ফিকশন’ গদ্য ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ (‘অরণি’, ১৯৪৪) ছন্দ নিয়ে কিশোর কবির এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু সামগ্রিক (সেই সময়ের নিরিখে) আলোচনা। রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন দত্তর পাশাপাশি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর, বিমলচন্দ্র ঘোষের ছন্দকুশলতার পর্যালোচনা করে শেষমেশ কিঞ্চিৎ প্রগল্ভ প্রশ্ন তোলেন সুকান্ত:২ “বুদ্ধদেব বসুর ছন্দের ধার দিন দিন কমে যাচ্ছে। তিনি গদ্য-ছন্দে লেখেন না কেন?” গদ্য-ছন্দের ব্যবহার ও পাঠ নিয়েও তাঁর কিছু মন্তব্য পাই এই লেখায়। তবে প্রবন্ধ রচনার কুশলতার দিক থেকে দেখলে একে হয়তো অপরিণত বয়সের প্রয়াস হিসেবেই দেখতে হবে। তবে সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতিও তাতে দুর্লক্ষ্য নয়!
সীমিত পরিসরের বর্তমান আলোচনায় সুকান্তর আখ্যান ও প্রবন্ধের সম্বন্ধে কিছু প্রাসঙ্গিক কথারই উল্লেখমাত্র করা গেল! দেখা গেল, তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ও মানসিক প্রবণতা শুধু তাঁর কবিতাকে নয়, তাঁর গদ্যকেও প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে! তাঁর চিঠিগুলি নিয়েও এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলবার অবকাশ রয়েছে। অবশ্য এ বিষয়ে ইতোপূর্বেই কিছু আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।১ শতবর্ষীয়ান ‘কিশোর কবি’র গদ্য রচনাকে তাঁর সমকালীন কবিতামালার পাশাপাশি রেখে আরও ব্যাপক ও সার্বিক বিশ্লেষণের উদ্যোগ শুরু হলে বর্তমান নিবন্ধের উদ্দেশ্য আংশিক সিদ্ধ হবে।
তথ্যসূত্র:
১। সরোজমোহন মিত্র, ‘কোরক সাহিত্য পত্রিকা’, শারদীয় ১৪১১, সম্পাঃ তাপস ভৌমিক (২০০৪); পৃঃ ৩১০-৩১৬।
২। সুকান্ত ভট্টাচার্য, ‘সুকান্ত-সমগ্র’, ৬ষ্ঠ সং, সারস্বত লাইব্রেরী, কলিকাতা (জ্যৈষ্ঠ ১৩৮০)।

