পঞ্চম বর্ষ – প্রথম সংখ্যা – বৈঠক
কেন সুকান্ত?
ঋদ্ধি রিত
স্বাধীনতা পত্রিকায় ১৮ই মে ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত ‘কবিও পেয়ে গেছে নতুন যুগ’ শীর্যক একটি লেখায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘‘জীবনে যেমন, কাব্য-সাহিত্যেও সরলতা বিশেষণটিতে রিক্ততার ইঙ্গিতটাই আমাদের কাছে বড় বেশি জোরালো। গভীরতা, ব্যপ্তি, তীব্রতা, ভাবৈশ্বর্য ইত্যাদি সবকিছুর ধারক ও বাহক হিসাবে সাদামাটা স্পষ্টভাষী সার্থক কবিতা কল্পনা করতে আমরা অপটু ছিলাম, আমাদের অভিজ্ঞতা ও স্বীকৃতি গীতি-কবিতা পর্যন্ত। সুকান্তর কবিতায় তাই বাংলা কাব্য-সাহিত্যের নবজন্মের সূচনা ছিল।’’
আজকের দিনে অনেকে যখন সুকান্তর কবিতার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তখন মানিককে ধার করে একথাই তুলে ধরা উচিৎ বলে আমার ধারণা। শ্রেণী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা বঞ্চিত লাঞ্ছিত শোষিত মানুষদের জীবনটাকে বদলে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে দেশে লড়াই সংগ্রাম করেন, বড়লোক গরিব লোকের মধ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে প্রতিবাদী করে তোলেন, চরম অসাম্যের ব্যবস্থাকে বদলানোর জন্য চিরন্তন সংগ্রাম চালান তাঁদের কাছে নজরুল সুকান্তদের কবিতা উদ্দীপনা জোগায়।
সুকান্ত এবং নজরুলের মতো কবিরা শক্তিশালী কণ্ঠে সমাজের নিপীড়িত মানুষের কথা বলেছেন। তাঁদের কবিতা প্রতিবাদী হলেও তা কখনও অসুন্দর নয়। ছন্দ, ভাব এবং প্রকাশভঙ্গি—সব মিলিয়েই এই কবিতাগুলি কবিতার মৌলিক শর্ত মেনে চলে। ‘হে মহাজীবন’ কবিতায় সুকান্ত গদ্যের কথা বললেও, সেখানে ছন্দ ও মিল স্পষ্টভাবে রয়েছে। আসলে তিনি কবিতার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে চেয়েছেন।
সুকান্তের কবিতায় দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রাম প্রধান হয়ে উঠেছে। তাই তিনি লিখেছেন—
‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’
এই পংক্তির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সৌন্দর্যের চেয়ে প্রয়োজনই বড়। পূর্ণিমার চাঁদের সৌন্দর্য তখন আর আকর্ষণীয় থাকে না, বরং একটি রুটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুকান্তের জন্মশতবর্ষকে সামনে রেখে তাঁর ভাবনা নতুন করে মনে করা জরুরি। তাঁর কবিতায় তারুণ্যের স্বপ্ন রয়েছে—একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম শক্তি হতে পারে তাঁর কবিতা ও গান।
বর্তমান সময়ে ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিজ্ঞান ও যুক্তির বদলে অনেক সময় অন্ধ বিশ্বাস গুরুত্ব পাচ্ছে। ইতিহাসকেও বিকৃত করে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা সমাজের অগ্রগতিকে বাধা দেয়। এই পরিস্থিতিতে প্রগতিশীল সংস্কৃতির ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের এই বাধাগুলিকে ভাঙার চেষ্টা করাই তার কাজ। সুকান্তের চিন্তা ও কবিতা এই লড়াইয়ে আমাদের শক্তি জোগায়। তিনি শুধু অতীতের কবি নন, বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও পথপ্রদর্শক।
শুধু কবিতার মাধ্যমেই নয়, নিজের কাজের মধ্য দিয়েও তাঁর কথার দায়বদ্ধতার প্রমাণ রেখেছেন সুকান্ত। তাঁর কবিতার ভাবনা শুধু পড়ার জন্য নয়, জীবনে গ্রহণ করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।
সুকান্তের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট (মতান্তরে ১৬ আগস্ট) এবং মৃত্যু ১৯৪৭ সালের ১৩ মে। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র কুড়ি বছর নয় মাস। খুব অল্প বয়স থেকেই তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। স্কুল জীবনে হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়’-এ লেখা দিয়ে তাঁর সাহিত্যজগতে প্রবেশ। পরে ‘শিখা’ পত্রিকায় ‘বিবেকানন্দের জীবনী’ প্রকাশিত হয়। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি ‘রাখাল ছেলে’ নামে গীতিনাট্য লেখেন। পড়াশোনার সময় নাটকে অভিনয়ও করেন এবং বন্ধু অরুণাচল বসুর সঙ্গে ‘সপ্তমিকা’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
১৯৪১ সালে তিনি আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে প্রথমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি করেন এবং পরে নিজের কবিতা পাঠ করেন। তাঁর লেখা গানও সে সময় জনপ্রিয় শিল্পী পঙ্কজ কুমার মল্লিকে সুর দিয়ে গেয়েছিলেন। কবিতা ছাড়াও তিনি গান, গল্প, নাটক ও প্রবন্ধ লিখেছেন।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন এবং ‘আকাল’ সংকলন সম্পাদনা করেন। তাঁর লেখার সময়কাল খুবই ছোট, মাত্র ছয়-সাত বছর। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কবিতা লিখেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ফ্যাসিবাদ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা—এই সব ঘটনার প্রভাব তাঁর কবিতায় স্পষ্ট। শোষণমুক্ত সমাজ, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন তাঁর লেখার মূল বিষয়।
সুকান্ত ছিলেন গণমানুষের কবি। নিপীড়িত, অবহেলিত মানুষের জীবনের কথা তিনি বারবার তুলে ধরেছেন। ব্রিটিশ শাসন, জমিদার, মুনাফাখোর ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী। তাঁর কবিতায় শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ডাক রয়েছে এবং মানবতার জয়গান শোনা যায়। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।
১৯৪৫ সাল থেকে তিনি ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার কিশোর বিভাগ সম্পাদনা করেন। তাঁর লেখায় মানুষের প্রতি গভীর মমতা ও প্রতিবাদের শক্তি রয়েছে, যা পাঠকদের অনুপ্রাণিত করে।
জীবদ্দশায় তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পর ‘ছাড়পত্র’, ‘পূর্বাভাস’, ‘ঘুম নেই’সহ একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সাধারণ বিষয়কে নিয়েও তিনি গভীর অর্থপূর্ণ কবিতা লিখেছেন।
সুকান্তের কবিতা আজও প্রাসঙ্গিক। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস তাঁর লেখা আমাদের দেয়। অল্প বয়সেই তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং আজও তিনি সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে আছেন। শতবর্ষ আসবে যাবে, কিন্তু সুকান্তের চিন্তা ও আদর্শ আমাদের কাজ ও ভাবনায় সবসময় বেঁচে থাকবে।

