পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা মুক্তগদ্য
আলো ও দূরত্ব বিষয়ক একটি গোপন উত্থান
সৌরভ বর্ধন
”কোনও দিকে কোনও সাড়া নেই, কারো মুখে কোনও কথা নেই, কেবল এক-একবার দেবলঋষি বলছেন — ‘তারপরে?’ আর নালকের চোখের সামনে ছবি আসছে আর সে বলে যাচ্ছে” : প্রতিবছর এই খারিফ শস্যের ঠিক আগে আগে এরকম গা-গরম করা জ্বর আসে আমাদের এখানে, আর সে নানান জনহিতকর কথা বলে যায় ব্যক্তিগত রোগীর সাথে। কী কথা, অন্য কেউ তা জানে না; কিন্তু সবারই মনে হয়, সেসব অনেক কথা। এখন যেমন শ্যাওলারাঙা দেয়ালে মৃদুমন্দ রোদ দেখেও বিড়ালটি স্থির হয়ে বসে আছে, লাফিয়ে পড়ছে না, এমন সব কথা; বৃহস্পতি গ্রহের ওপর যে-বছর ‘শ্যুমেকার-লেভি’ নামে বৃহৎ ধূমকেতুটি উথলে পড়েছিল, সে-বছরই বাংলা মতে তেইশে ভাদ্র আমার সপিণ্ডন সমাপ্ত রেখে জন্ম নিয়েছিল আলো ও দূরত্ব বিষয়ক একটি নবীন উত্থান — হংসছন্দের প্রতিবর্ত ক্রিয়া, এমন সব কথা — যেসব কথার মাথা, মুণ্ডু, খুলি মায় ঘিলুও নেই। অথচ অনেকক্ষণ হয়ে গেল নালক জানলার ধারে বসে বসে বেড়ালটার ছবি আঁকছে, শুধু মাঝে মাঝে ম্যাও-ম্যাও করা ছাড়া আর কোনো জ্বালাতন নেই ওর। তবে নালক বুঝতে পারছে, এরকম দিন থাকবে না চিরদিন, শীঘ্রই এলোমেলো হয়ে যাবে দূর, ঘোর আর ঘোরতর স্ক্র্যাপবুক জ্বলে উঠবে। যদিও বৃষ্টির নাম আর গন্ধ এখন চারিদিকে, তবুও জ্বলবে, রবীন্দ্র গানের মুখোমুখি বসবে ওর ছায়া আর ছাউনি। ছায়া বলতেই ওর মনে পড়ল ছায়াদির কথা, ক্লাসিক গল্পের মতো এক সন্ধেবেলা ভরা পুকুরে নাইতে নেবে যে আর উঠে আসেনি। কেউ জানতেও পারেনি ওই ভরসন্ধ্যায় সে কেন নেমেছিল পুকুরে; অথচ তাকে নামতে অনেকেই দেখেছিল, আর তুলেছিলও অনেকে মিলে। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত কোনো থ্রিলার হতে যাচ্ছে! — আজ্ঞে না। গত শতাব্দীর প্রথমার্ধের এঁদো গ্রাম আর খাদ্য আন্দোলন, কিংবা শিল্প বিপ্লব আর প্রেমের গল্প! নাকি ইতিহাস নির্ভর কিছু! ও আচ্ছা, তাহলে জাদুবাস্তবতাই হবে! — আসলে কেউ জানে না কী হবে, কিন্তু সবাই চিন্তিত। এমন ভান করছে যেন এই শ্রেণিবিভাগটা হয়ে গেলেই সমস্ত সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়, আর কোনো নাটকীয়তার দরকার পড়ে না। কিন্তু হঠাৎই ঘুমের ধাক্কায় ম্যাজিক খুলে যায় —
নালকের ফোনে ইয়ানির নস্টালজিয়া বেজে ওঠে, সুযোগ বুঝে বেড়ালটাও উঠে পড়ে ডিভান থেকে — আর ক্যানভাসের সমস্ত রং ঝরে মেঝেতে মাখামাখি। ম্যাও-ম্যাও করতে করতে ওরা উড়ছে, আর মিশে যাচ্ছে বাতাসে। এমনভাবে মিশছে যেন গন্ধ লাগছে খুব, ওপার থেকে যে মহিলা কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, গন্ধে তার বমি-বমি ভাব। তবু নালক উৎসাহ নিয়েই কথা বলে, অথচ চাইলে সে কথা কাটাকাটি করতে পারত, সে সুযোগ ছিল। কিন্তু মহিলা বলে বসলেন, ”জানো তো, সেদিন আমাকে চাপা দেবার জন্যই হলুদ বাসটা এগিয়ে আসছিল। আমি যদি একবার টের পেতাম এটা, কিছুতেই আর রাস্তায় ঘুমাতাম না। অথচ আমি জানতাম, মানে আমাকে জানানো হয়েছিল যে রাস্তায় শোবার স্বাধীনতা আমার আছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, বাসটাকেও দেওয়া হয়েছিল ওই একই ছাড়পত্র — রাস্তার মাঝখান দিয়ে যাবার। কী অদ্ভুত ব্যাপার বলো!” — নালক দেখল ভাবগতিক ভালো নয়। গতকাল রাতে দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা মাছের একটা অংশ সে জিভ দিয়ে টেনে ফুৎ করে ছুঁড়ে মেরেছিল বেসিনের ওপরের দিকে থাকা লাল দেয়ালটায়, ভেবেছিল রাতের মধ্যেই, যখন চারিদিকে সবাই ঘুমিয়ে পড়বে, কোনো মাকড়সা বা টিকটিকি এসে খেয়ে নেবে ওই মাছ, ওরা তো সচরাচর মাছের স্বাদ পায় না। তাই আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে আগে এসেছিল এই প্রকল্পটা দেখতে, কিন্তু দেখা হয়নি; তার আগেই ছায়াদি তার বেড়ালটাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল একটা পোর্ট্রেটের আবদার নিয়ে। তারপর এই তো ফোন করল। ফোন আবার রাখতে না রাখতেই সে এখন নিজেই এসে হাজির।
— এরকমই সাতটা সমুদ্র আর পাঁচটা মহাদেশ নিয়ে ভাবতে ভাবতে নালক তড়িঘড়ি নেমে এলো সিঁড়ি বেয়ে। এসে দরজা খুলেই দ্যাখে তার বাড়ির সামনের ল্যান্ডস্কেপ একদম বদলে গেছে, স্বপ্নে যেমনটা হয় আরকি। গেটের দুপাশে দুটো বেলি-টগর পাল্টে হয়েছে বোগেনভেলিয়া, প্লাস্টিকের বোতল কেটে বানানো টবে পাথরকুচি গাছটা বেশ বড়ো হয়ে গেছে, তুলসী পাতার রং তেমনই রাধামাধব, কিন্তু তার মঞ্জরী হয়েছে হলুদ রঙের। বাড়ির উল্টো দিকেই ছিল সিদ্ধি জ্যাঠাদের বাড়ি, সেটা আর নেই, বদলে ছোটো-বড়ো পামগাছের একটা সাজানো বাগান মতো হয়েছে; ডানদিকের যে বাড়িটায় সুধার মা পাগলী হয়ে কাটিয়েছিল প্রায় দু-দশক — ওঁর ছোট ছেলেটা গলায়দড়ি দিয়েছিল এই বাড়িতেই, এখন আর ওঁর ছেলের মুখটা মনে পড়ে না ভালো করে; এই তো গত বছর পাগলীও মারা গেল, এখন ওঁর অশীতিপর বরটা কোনোরকমে দিন কাটায় — প্রায় ভেঙে পড়া একটা ঘর, ইটের দেয়াল কিন্তু মাটির গাঁথনি, দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে এখন নানান জাতের সাপের বাসা, দিনের যেকোনো সময় ওদের যাওয়া আসা দেখা যায় — বুড়ো দিব্যি আছে ওদের নিয়ে — নিজেই রাঁধে নিজেই খায়, মাঝে মাঝে দূরের কোন গ্রাম থেকে ওঁর এক মেয়ে আর নাতনি আসে দেখা করতে, সেদিন বাড়িতে একটু কথাবার্তা শোনা যায়, আলো দেখা যায়, বাকি দিনগুলো শুনশান — নালকের ইচ্ছা করে ওই ঘরে ঢুকে দেখতে কী ঐশ্বর্য ওখানে আছে, উনি কি নির্জন কোনো কবি, একাকী আড়ালে বসে রচনা করছেন কোনো সাংকেতিক কাব্যের শরীর! — সেই বাড়িকে এখন লাগছে গেটের সামনে ফলক বসানো বাগানবাড়ি, সেও শান্ত চুপচাপ। আর বাঁদিকে ছিল লক্ষণের ভিটে, ওদের বাড়ি এখন উইয়ের দখলে, ওর দাদা রাম ছিল নালকের বাবার স্কুলের বন্ধু, গাঁজার নেশায় সেও পাগল হয়ে গেছিল; নালকের মনে পড়ল ছোটবেলায় তাকেও রাম পাগলার ভয় দেখিয়ে খাওয়ানো হতো, পড়তে বসানো হতো। একবার কালি পুজোর দিন সকালবেলা নতুন পাড়ার আমবাগানে আবিষ্কার হলো রাম পাগলার কুকুর-শেয়ালে খাবলানো দেহ। সেই বাগান এখন ইকো-রিসর্টের কারবারিদের হাতে, লাল ইটের গুঁড়ো দিয়ে মোরাম রাস্তা তৈরি হয়েছে, নানান নামের ফলক বসেছে এখনই, আর সবসময় দুটো রোলার ইঞ্জিন দাঁড়িয়ে থাকে গেটের পাশেই। নালকের ইচ্ছে আছে তার নিজের বাড়ির গেটটাকে আর্চ টাইপের করে তার ওপর কাগজী ফুলের কিংবা অপরাজিতা ফুলের লতা বেয়ে বেড়াবে আর ফলকে থাকবে বাড়ির নাম ‘বসন্তবৌরি’ — এমন করবে; কিন্তু স্বপ্নে এটা সত্যি হলো না, হলো কিছু উদ্ভট বদল। পাড়ায় যে দুয়েকটা মুদিখানা দোকান ছিল, সেসবও এখন উধাও। শুধু লম্বা রাস্তা চলে গেছে দূরে, যেমন রাস্তা দেখলে হাঁটবার লোভ হয়, মনে হয় হাঁটলেই ময়ূরের দেখা পাওয়া যাবে, অথবা হাঁটা শেষে যে তালসারি আর বাঁশ বাগানে ঘেরা পুকুরটা দেখা যাবে, তাতে মৃণাল ও মৃণালিনী ফুটে থাকবে, তাদের অসংখ্য পাতার মোম পায়ে মেখে জলপিপি হেঁটে যাবে, খাবার খুঁজবে, ডিমে তা দেবে ওদের পিতা। এইসব বদল নালকের ভালো লাগল, মনে হলো এবার হাঁটা যাক। হাঁটতে শুরু করল, চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মেলানোর চেষ্টা করল কোথায় কী বর্ণের পতন ঘটেছে, বদলে গেছে কোন কোন রং। ওরা আগে যে পুরোনো বাড়িতে থাকতো তার ডানপাশে ইট-ভাটা ছিল, পেছনে ছিল গোরস্থান — প্রথমে মাটির ছিল, তারপর ভাঙা ইট, এবং গতকাল রাতেও ছিল কংক্রিটের ঢালাই রাস্তা, আর এখন লালমাটির চড়াই রাস্তা দিয়ে সে হাঁটছে, দুদিকে কিছু কিছু গাছ, বড়ো বড়ো, সম্ভবত পর্ণমোচী। এই পুরোনো বাড়ির কথা উঠলেই নালকের মন খারাপ করে, ওর মনে হয় — বাড়ি পরিবর্তন করায় আমার প্রিয় পাখিদের আমি হারিয়ে ফেলেছি। আগে আমার জানলায় সারাদিন পাখির কিচিরমিচির ছিল, কত কত পাখি আসতো তখন। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠেঘাটে ঘুরতে যাওয়া ছিল। শিহরিত হওয়ার মতো আনন্দ ছিল, প্রতিটি পাতার কম্পনে আমার অনুভূতি জাগতো। একেকদিন রাতের বেলা পুরোনো বাড়িতে আমার ঘরটা জোনাকিতে ভরে যেত — নীল মশারির মধ্যে আমি একলা শুয়ে আছি আর আমার অন্ধকার ঘরে অসংখ্য জোনাকির মিটিমিটি আলো; আমি হা হয়ে থাকতাম। আহা! সেসব রাত। আবার সকালবেলা আমি আর বাবা মিলে কাঠবেড়ালি আর পাখিদের খাওয়াতাম। পড়িয়ে বাড়ি ফিরলেই আমার বেড়ালটা পা ঘেঁষে ঘেঁষে ঘুরতো, আমি যেদিকে সেও সেদিকে। তারও আগে আমার একটা পোষা মুরগি ছিল, সে আমার ঘরে ছাড়া রাতে কোথাও থাকত না, ডিম পাড়লে একমাত্র আমাকেই সে ডিম নিতে দিত, অন্য কেউ নিতে গেলে ঠুকরে লাল করে দিত হাত; কখনও রাস্তায় দেখা হলে উড়ে এসে আমার সাইকেলে বসতো। বেশ ছোটবেলায়, যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, আমাদের এলাকায় ইলেকট্রিকের ব্যবস্থা ছিল না, তখন গরমকালের রাতে আমরা বাইরের উঠোনে বিছানা করে শুতাম, একেকদিন মাঝরাতে কবর দিতে আসতো ঘড়ামি পাড়া বা গোপালপুর থেকে। আমরা উঠোনে শুয়ে হাঁ করে দেখতাম গোরস্থানের অন্ধকার জঙ্গলে হ্যাজাকের জোরালো আলো জ্বলে উঠেছে, মানুষের হাঁটাচলা, ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে কোদালের, কবরের জন্য মাটি কাটা চলছে। খানিক বাদেই মড়া কাঁধে করে আরও কয়েকজন আসে। তারপর আমরা আর কিছু দেখতে পেতাম না, মা বা ঠাম্মা চোখ ঢেকে দিত, বলত আর দেখতে হবে না, দেখলে ভয় পাবি। বাবা তখন ইট-ভাটায় থাকতো, রাত পাহারার কাজে। বাবা ফিরতে ফিরতে আমরা ভাইবোনেরা ঘুমিয়ে পড়তাম। পরদিন কয়েকজন খুদে মিলে খুঁজতে যেতাম নতুন কবরটা। কোনো কোনো দিন পেয়েও যেতাম খুঁজে। তখন ভয় আর বিস্ময়ের আনন্দ-মাখানো যে অনুভূতি আমাদের আঁকড়ে ধরত, তার তুলনা চলে না। কয়েকবছর আগে অবধিও আমি এসব নিয়ে কাটিয়েছি। এখন সেসব স্বপ্ন মনে হয়। জলজ্যান্ত শ্লথ। যদিও এখন ভালো কিছু বই আছে আমার, কিন্তু সেসব পড়া হয় খুব কম, এই দুঃখেই শেষ হয়ে যাচ্ছি। নানারকম কৃত্রিম আনন্দের ব্যবস্থা চারিদিকে; ফল স্বাভাবিকভাবেই ভালো হচ্ছে না। কেবলই হারিয়ে যাচ্ছি উদ্ভট স্বপ্নের মধ্যে —
নালক একবার ভাবল লুসিড ড্রিমিং হচ্ছে হয়ত ওর সাথে, কিন্তু ও কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না দৃশ্যগুলো। ওর মনে হচ্ছে, একেকটা দৃশ্য যেন একেকটা দেশ — ক্রমাগত যুদ্ধ হচ্ছে, কিন্তু কেউ কারো জমি, প্রদেশ দখল করছে না, করছে স্বপ্নের দখল। নিয়ন্ত্রণ করছে অন্যের সাথে ঘটে যাওয়া দৃশ্যের। যুদ্ধের অভিমুখ ক্রমশ এগিয়ে আসছে নালকের শরীরে — এআই দিয়ে মডিফাই করা চুল ভেঙে যাচ্ছে, চোখ-মুখের ঘিবলি টাচ উধাও হয়ে যাচ্ছে। এত বেরঙিন ফ্যাকাশে পোশাক শেষ কবে পরেছিলাম আমি, মনে পড়ছে না। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি বেমানান বস্তুকণার মতো রাস্তায় গড়িয়ে যাচ্ছি আমি আর ছায়াদি। আমাদের কোনো ক্যাটালগ নেই, বৃক্ষের মতো শাখাপ্রশাখা নেই, আমরা আদি ও অনন্ত জীবাশ্ম-টুকরের মতো হেঁটে যাচ্ছি। হাঁটছি, অথচ কোথাও পৌঁছচ্ছি না। দেখছি, অথচ কিচ্ছু দেখছি না।
সৌরভ বর্ধন। শান্তিপুর। নদিয়া। ফোন : ৮০১৬০৭১৫২০

