ক্ষণিকের সফর : বনলতা এক্সপ্রেস – দেবার্ঘ্য দাস
চলচ্চিত্র : বনলতা এক্সপ্রেস
পরিচালক : তানিম নুর
প্রযোজনা : তানিম নুর
সহ প্রযোজনা : আসিফ সালেহ, শর্মিলা আক্তার, সাকিব খান ও টিম হইচই
চিত্রনাট্য ও সংলাপ : সামিউল ভূঁইয়া / আয়মান আসিব স্বাধীন
চিত্রগ্রহণ : বরকত হোসেন পলাশ
সম্পাদনা : সালেহ সোবহান অনীম
সঙ্গীত পরিচালক : জাহিদ নিরব
প্ল্যাটফর্ম : হইচই
চলচ্চিত্র অনেক সময়ই একটি গল্প বা উপন্যাসের পাঠ হিসেবে দেখা হয়েছে। পৃথিবীর বহু ভাষায় সেটি হয়ে এসেছে। আমাদের বাংলা সিনেমাতেও সেই উদাহরণ অজস্র। পাশাপাশি ট্রেন এবং ট্রেনের মধ্যেকার চরিত্রদের ভাবনা চিন্তা কার্যকলাপ গল্প এবং সিনেমার পটভূমিকায় রয়েছে সেরকম উদাহরণ ও রয়েছে। এবং জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হিসেবেও সেইগুলো থেকে গেছে আইকনিক হিসেবে;
“আমার এই উপন্যাসটা ট্রেনের কামরায় শুরু, সেখানেই শেষ। কাহিনী শেষ হয়ে গেছে – ট্রেন চলছেই। এই ট্রেনের শেষ গন্তব্য অপূর্ব লীলাময় অলৌকিক কোনো ভুবন।…”
হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস “কিছুক্ষণ” থেকে সম্প্রতি তানিম নুর সিনেমা বানিয়েছেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’।
ছবিটি হুমায়ূন আহমেদের -এর কিছুক্ষণ অবলম্বনে নির্মিত হলেও, পরিচালক তানিম নুর কেবল অভিযোজন হিসেবে রাখেননি; তিনি চলচ্চিত্রকে সমকালীন বাংলাদেশের এক সামাজিক রূপকে রূপান্তর করেছেন। সিনেমাটি মূলত একটি “moving chamber drama”—একটি চলমান ট্রেনের মধ্যে দাঁড় করানো ক্ষুদ্র সমাজ, যেখানে বাংলাদেশের শ্রেণি, ক্ষমতা, প্রেম, ব্যর্থতা, রাজনীতি, ধর্ম, মৃত্যু ও মানবিকতার বিভিন্ন স্তর একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
বাংলা সাহিত্য ও সিনেমায় ট্রেনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক সবাই ট্রেনকে ব্যবহার করেছেন ‘ট্রানজিশন’ -এর প্রতীক হিসেবে।
কিন্তু বনলতা এক্সপ্রেস -এ ট্রেন কেবল যাতায়াত নয়। এটি বাংলাদেশের miniature republic। যেখানে বিভিন্ন কামরায় বিভিন্ন স্তরের মানুষের সহবস্থান এবং কার্যকলাপ, কথোপকথনে মধ্যে ধরা পড়ে একটি চলমান রাষ্ট্র।
ট্রেনের করিডরকে কেন্দ্র করে framing গড়ে ওঠে।
Vertical power hierarchy-এর বদলে Horizontal relationship তৈরি হয়। ক্যামেরা প্রায়শই— ‘eye level medium shot ensemble composition’ ব্যবহার করে। তাই সিনেমা দেখতে দেখতে মনে হবে সেই ট্রেনে আপনি নিজেও সেই ট্রেনের মধ্যে থাকা এক সহযাত্রী । চলচ্চিত্রটি কোনো একটি নির্দিষ্ট গল্পের সুরে বাধা নয়, বিভিন্ন কামরায় থাকা বিভিন্ন মানুষদের নিজেদের আশা আকাঙ্খা, বোধ দর্শন এবং ক্ষণিকের আলাপচারিতা এইসব টুকরো টুকরো গল্পাংশ নিয়েই চলচ্চিত্রের সামগ্রিক সুর।
ট্রেনের করিডোর, কামরা, জানালা— ঘুরেফিরে লোকেশন আপাত বদ্ধ থাকলেও কখনো স্থির মনে হয় না। স্থির ব্যাকগ্রাউন্ডও একঘেয়ে লাগে না। প্রতিটি চরিত্র ট্রেনে ওঠে এক পরিচয়ে, নেমে যায় অন্য পরিচয়ে।
করিডোরে যখন মন্ত্রী হাঁটেন, সেটি ক্ষমতার করিডোর।
একই করিডোরে যখন ব্যর্থ প্রেমিক হাঁটেন, সেটি অস্তিত্বের এবং সেই একই করিডোরে মৃতদেহ পড়ে থাকলে, সেটি মৃত্যুর করিডোর – লোকেশন একই, অর্থ বদলে যায়! ক্যামেরা তাই স্থানকে নয়, মানুষকে অনুসরণ করে।
চলচ্চিত্রে ট্রেন গন্তব্যের প্রতীক নয়। এখানে ট্রেন হলো জীবন। কেউ টিকিট কেটে উঠেছে। কেউ বিনা টিকিটে। কেউ ভুল কামরায়, কেউ নেমে যাবে শেষ স্টেশনের আগেই। ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতেও বেজে ওঠে এক সুর –
‘জীবন এক চলমান কাফেলা;আমরা কেবল ক্ষণিক যাত্রী।..’
বনলতা এক্সপ্রেস -এও কেউই নায়ক নয়। সবাই যাত্রী। একাধারে গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং কবি ওমর খৈয়াম ফিরে ফিরে আসেন। খৈয়ামের ভাষায়: “চাকা ঘুরতেই থাকবে; মানুষ কেবল তার ছায়া।”
মন্ত্রী ভাবেন ক্ষমতা চিরস্থায়ী। ডাক্তার ভাবেন যুক্তি সবকিছুর সমাধান। প্রেমিক ভাবেন ভালোবাসাই সব। ধর্মপ্রাণের কাছে নৈতিকতার মালিক তিনিই।
কিন্তু একটি দুর্ঘটনা বা একটি রাত তাদের সব বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। বনলতা এক্সপ্রেস যেন সেই ঘূর্ণনেরই সিনেমাটিক প্রকাশ।
সিনেমায় খৈয়ামের দর্শনের পাশাপাশি এসেছে পিথাগোরাসের উল্লেখ ;
পিথাগোরাস বিশ্বাস করতেন—
বিশ্ব সংখ্যার সম্পর্কের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
বনলতা এক্সপ্রেস -এর কাঠামোও তাই।
এখানে প্রতিটি চরিত্র একেকটি বিন্দু।
তাদের সংঘর্ষে তৈরি হয় অদৃশ্য জ্যামিতি।
মন্ত্রী ↔ সাধারণ মানুষ
ডাক্তার ↔ রুগী
প্রেম ↔ বাস্তবতা
ক্ষমতা ↔ নৈতিকতা
মৃত্যু ↔ জীবন
এই সম্পর্কগুলো একসাথে একটি মানবিক ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, বহুভুজ নির্মাণ করে। ফলে ছবির আসল নায়ক কোনো ব্যক্তি নয়। সম্পর্কই এ ছবির ভরকেন্দ্র।
এই সিনেমার অন্যতম শক্তি কমেডি ও সংলাপ। হাস্যরস হলো অস্ত্রোপচারের আগে দেওয়া অ্যানেস্থেসিয়া।
আপনি হাসছেন। তারপর পরিচালক ধীরে ধীরে আপনার বুকে ছুরি বসিয়ে দেন। এই কৌশলটি Federico Fellini অথবা Emir Kusturica-র মানবিক কমেডির কথা মনে করিয়ে দেয়।
হাসির ভেতরেই ট্র্যাজেডি।
ট্র্যাজেডির ভেতরেই হাসি।
ফলে দর্শক আবেগতাড়িতভাবে কখনো স্থির হতে পারে না।
সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্রের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় চলচ্চিত্রের ভাষা ও সংলাপ। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় বড্ড বেশি সাহিত্যপ্রায় সংলাপ সিনেমার ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। এই ক্ষেত্রে সামিউল ভূঁইয়া এবং আয়মান আসিব স্বাধীন তামিম বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। অনাড়ম্বর এবং দৈনন্দিন জীবনের ভাষা এমনকি ট্রেনে সহযাত্রীদের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলি সিনেমার চরিত্ররা সেই ভাষাতেই বলে থাকেন। বিশ্বসিনেমায় Asghar Farhadi-র স্ক্রিপ্টের অন্যতম বৈশিষ্ট্য-
অনেক সময় সংলাপ তথ্য দেয় না। চরিত্রের মুখোশ খুলে দেয়। বনলতা এক্সপ্রেসের চরিত্ররা যা বলে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তারা কী লুকোয়!
বরকত হোসেন পলাশ-এর ক্যামেরা এখানে সৌন্দর্য খোঁজে না। খোঁজে মানুষ। সিনেমায় ক্লোজ-আপের ব্যবহার অসাধারণ। জানালার কাচ। কুয়াশা। ট্রেনের কম্পন। ম্লান আলো।
উপন্যাসে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল “নীরবতা”। সিনেমা সেই নীরবতাকে ভিজ্যুয়াল রিদমে রূপান্তর করেছে।জানালার বাইরে অন্ধকার। দীর্ঘ করিডোর। অপেক্ষমাণ যাত্রী। দুলতে থাকা আলো। স্থির ট্রেন। এই সবকিছু মিলিয়ে পলাশ এমন এক “temporal suspension” তৈরি করেন যেখানে সময় যেন চলছেও, আবার থেমেও আছে। এখানে আমার বারবার মনে পড়ে Andrei Tarkovsky-র একটি ধারণা—
‘Cinema is sculpting in time’.
‘কিছুক্ষণ’ যেখানে ভাষার মাধ্যমে সময়কে অনুভব করায়, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সেখানে ক্যামেরার মাধ্যমে সময়কে দৃশ্যমান করায়। সব মিলিয়ে ছবিটি মাঝে মাঝে ‘Snowpiercer-এর সামাজিক বদ্ধতার’ কথা হালকা মনে করালেও স্বভাবগতভাবে বনলতা এক্সপ্রেস আদ্যোপান্ত বাঙালি ছবি। অনেক করিডর শটে character-দের একসঙ্গে compressed দেখা যায়।
যারা সামাজিকভাবে দূরে— দৃশ্যত তারা কাছাকাছি।
যারা কাছাকাছি— মনস্তাত্ত্বিকভাবে দূরে। এটাই ছবির কেন্দ্রীয় প্যারাডক্স।
পাশাপাশি ছবিটি রাজনৈতিক সচেতনতার কথা বললেও রাষ্ট্রের নানান ক্ষমতার সেই সফর মূলত আসে উপলব্ধির স্তরে, কিন্তু রাষ্ট্রকে কখনও দেখানো হয় না।
রাষ্ট্র এখানে— টিকিটে, শ্রেণিবিভাগে, আচরণে, ক্ষমতার অদৃশ্য বণ্টনে উপস্থিত। “distribution of the sensible” এর ধারণা দিয়ে বললে—
বনলতা এক্সপ্রেস দেখায় –
কে কথা বলতে পারে। কে চুপ থাকে। কার গল্প শোনা হয়। কার গল্প হারিয়ে যায়!
প্রশ্ন হতে পারে অভিনেতা অভিনেত্রীদের কথা আলাদা ভাবে বলা হচ্ছে না কেন? মন্ত্রীর চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী, গণিত দৈত্য মোশাররফ করিম, ডাক্তার শরিফুল রাজ, মন্ত্রীর স্ত্রী বাধন, সহযাত্রী সাবিলা, ডাক্তারের মায়ের চরিত্রে সামিমা নাজনিন, মৌলবী শ্যামল মোওলা, মৌলবীর মেয়ের চরিত্রে ত্রিধা এবং বাকী সবার অভিনয় অনবদ্য। তাঁদের সবার অভিনয় এতটাই সাবলীল যেন পর্দায় আলাদা করে চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম কে দেখা যাচ্ছে না উলটে যেন গল্পের পাতা থেকে উঠে আসা মন্ত্রী, গণিত দৈত্য, ডাক্তার, ছোট্ট মেয়ে হিসেবেই প্রত্যেক কে পাওয়া গেছে। এবং তাঁদের অভিনয় নিয়ে কথা বলতে গেলে ছবির আসল মজাটাই হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে সিনেমায় থাকা গল্পের মেজাজ। যেহেতু চরিত্ররা তাদের কার্যকলাপে গল্পের জার্নি তাই সেটি ইচ্ছে করে ‘নিচু তারে’ বাধা রইল। তাই অভিনয় কেমন হয়েছে প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর সিনেমাটি দেখতে হবে।
সিনেমার অন্যতম সম্পদ এই সিনেমায় ব্যবহৃত গান। প্রত্যেকটি গান – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত গানের পাশাপাশি বাংলাদেশের আধুনিক গানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হয়। সঙ্গীত পরিচালক জাহিদ নিরব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে গানগুলিকে ব্যবহার করেছেন, সিনেমায় ‘সিনের দাবী’ অনুযায়ী খুব সহজভাবেই যেন এই গানগুলি-ই মাথায় আসে।
চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত গান : চাইতে পারো ২ ( অর্থহীন)
উড়াল দেবো আকাশে ( আইয়ুব বাচ্চু)
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) ( অর্ণব)
বাংলাদেশ : এল আর বি
১০২০'( সামিউল হক)
সাহিত্যনির্ভর ছবির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বারবার ফিরেফিরে আসে- সিনেমায় উপন্যাসের সুর কতটা অপরিবর্তিত রয়েছে?
উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু হলো—
“মানুষ ক্ষণিকের জন্য একে অপরের জীবনে আসে।”
সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু হলো—
“বাংলাদেশের সমাজ ক্ষণিকের জন্য একটি ট্রেনে বন্দি।”
দুটো এক নয়। উপন্যাস বেশি অস্তিত্ববাদী। সিনেমা সেদিক থেকে সমাজতাত্ত্বিক। উপন্যাসে আপনি মানুষের নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন। সিনেমায় আপনি মানুষের পারস্পরিক সংঘর্ষ অনুভব করেন। তাই বলা যায়— সুর পুরো বদলায়নি। কিন্তু স্কেল বদলেছে। ইনার ফিলোসফির থেকে আউটার সোশিয়লজি -তে স্থানান্তর হয়েছে।
পাশাপাশি এই প্রশ্নও থাকে – সিনেমাটি কি উপন্যাসের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়?
আমার মতে, এটাই ছবিটির সবচেয়ে বড় অর্জন।
আজকের অধিকাংশ এডাপটেশন বইকে প্রতিস্থাপন করতে চায়।
বনলতা এক্সপ্রেস বইকে প্রতিস্থাপন করে না। বরং বইয়ের প্রতি কৌতূহল তৈরি করে। সিনেমা শেষ হওয়ার পর আপনার মনে প্রশ্ন জাগে— শুধু গল্প জানার জন্য নয়, বরং বোঝার জন্য যে এই সমস্ত চরিত্র, এই অপেক্ষা, এই ক্ষণিক সংযোগ— হুমায়ূন আহমেদ -এর গদ্যে কতটা নীরব, কতটা বিষণ্ণ, আর কতটা মানবিক ছিল। এই প্রশ্নগুলোই পাঠককে মূল টেক্সট এর কাছে ফিরিয়ে আনে।
তখন বোঝা যায়, বনলতা এক্সপ্রেস উপন্যাসের সিনেমাটিক অনুবাদ নয়। সিনেমাটি উপন্যাসের সঙ্গে এক দীর্ঘ আলাপ। বইটি সেই আলাপের উৎস, আর সিনেমাটি তার সমকালীন প্রতিধ্বনি।



