পোচতা ও রবীন্দ্রনাথ – সংহিতা রায়
১৯৪২-এর ৬ অগাস্ট। পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহর। সবে প্রাতরাশ শেষ করে দিনের কাজ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে মানুষ। হঠাৎ দেখা গেল শহরের মাঝখানে খুদেদের লাইন। তাদের গায়ে ঝকঝকে পোশাক। হাতে প্ৰিয় পুতুল। কারও হাতে বই বা ডায়েরি। মুখে এক রাশ খুশি। এগিয়ে চলেছে ১৯৫ জন শিশু। সেই লাইনের একেবারে প্রথমে তাদের প্ৰিয় মাস্টারমশাই। ইয়ানুশ কোরাচাক। তাঁর কোলে সবচেয়ে খুদে সদস্য। আর হাত ধরে আছে আরও এক খুদে।
তাদের কাছে রাজার চিঠি এসেছে। অপেক্ষা করছে ছুটি-ছুটির রেলগাড়ি। এক মাইল পথ পেরলেই পৌঁছে যাবে সেখানে। গন্তব্য ক্রেবলিন।
কী আছে ক্রেবলিনে? কেন তারা যাচ্ছে?
সে কাহিনী জানতে হলে, একেবারে শুরুতে যাওয়া যাক।
১৯৪২ সাল। নাৎসি বাহিনীর তাণ্ডব দেখছে দুনিয়া। পোল্যান্ড তখন হিটলার বাহিনীর দখলে। অত্যাচারে তোলপাড় গোটা দেশ। নিশানায় সে দেশের ৩৫ লক্ষ ইহুদি।
তাদের ভিটে থেকে উৎখাত করে আনা হয়েছে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। শিশুদের মিছিলের পুরোভাগে যিনি ছিলেন সেই কোরচাকের একটি অনাথ আশ্রম ছিল শহরে। প্রায় ২০০-এর কাছাকাছি শিশু থাকত সেখানে। ৬৪ বছরের এই মানুষটির একাধিক পরিচয় ছিল। ঘনিষ্ঠ মানুষদের কাছে তিনি ‘জিনিয়াস’! একদিকে শিক্ষাবিদ, অন্য দিকে চিকিৎসক আবার সাহিত্যিক।
তাঁর আশ্রমের শিশুদের পাঠানো হয়েছিল ইহুদি ঘেটোতে। মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন, উঁচু পাঁচিলঘেরা এক জেলখানায়। ভিতরে-বাইরে পাহারায় সেনারা।
বছরের মাঝামাঝি সময়ে চিঠি এল ক্রেবলিন যাওয়ার। সে এক মৃত্যু কূপ। গ্যাসচেম্বার। এ চিঠি মৃত্যুর নিমন্ত্রণপত্র।
শিয়রে শমন। কিন্তু কোরচাক শিশুদের কীভাবে জানাবেন সে খবর। যাদের জীবন শুরুই হল কীভাবে দেবেন তাদের শশেষের খবর। বিপন্ন কোরচাক স্মরণ নিলেন প্রাচ্যের কবির। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ তখন পৃথিবী বিখ্যাত। পোলিশ ভাষায় দুটি অনুবাদও বেরিয়েছে। পোলিশ শিক্ষাবিদ ঠিক করলেন মঞ্চস্থ করবেন সেই নাটক। তিনি নাটকের নাম দিলেন ‘পোচতা’। পোলিশ ভাষায় ‘ডাকঘর’।
‘ডাকঘর’-এর অমল রোজ অপেক্ষা করত রাজার চিঠির জন্য। মৃত্যুকে বেদনায় নয়, আনন্দে গ্রহণ করেছিল সে। কোরচাক চেয়েছিলেন, তাঁর শিশুরাও যেন অন্তিমের কঠিন পথটুকু সহজ ভাবে অতিক্রম করতে পারে। ছোট ছোট মিটিমিটি তারার মতো জীবনগুলো যেন একবার নিজের আলোয় জ্বলে ওঠার সুযোগ পায়। মৃত্যুর সনদে লেগে থাকুক অমল আলোর রোদ্দুর। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন মঞ্চ।
১৯৪২-এর ১৮ জুলাই ওয়ারশর ঘেটোতে মঞ্চস্থ হল ডাকঘরের অনুপ্রেরণায় ‘পোচতা’। পরিচালনায় কোরচাকের ঘনিষ্ঠ এস্তেরকা ভিনোগ্রন। অমল, দইওয়ালা, সুধাদের বাছা হল আশ্রমের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে থেকেই। গ্যাসচেম্বারে মৃত্যুর আগে ক্ষণকালের জন্য হলেও শিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল তারা। নাটক শেষ, দর্শকাসন চুপ। নীরবতা আর অন্ধকার যেন গ্রাস করেছে। মঞ্চের শিশুরা আর কদিন পর-ই মিলিয়ে যাবে। হলোকস্ট- এ সত্যের কোনও পরিবর্তন নেই যে। রাজার চিঠির এত ভার কেন!
১ অগাস্ট গ্রেফতার করা হল নাটকের পরিচালককে। বিজ্ঞানের ছাত্রী সেই মেয়েটির মুক্তির জন্য দরজায় দরজায় ঘুরেছিলেন কোরচাক। কিন্তু এস্তেরিকার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার আড়াই সপ্তাহের মধ্যেই এল সনদ। ৬ অগাস্ট ছিল ঘেটোয় কোরচাক আর শিশুদের একত্রবাসের শেষ দিন।
সেদিন সবে মাত্র প্রাতরাশ শেষ করেছে তারা। হঠাৎ দরজায় ভারি বুটের আঘাত। মাইকে নির্দেশ এল ‘সব ইহুদিরা বের হও’।
কোরচক সব শিশুদের জড়ো করলেন। পরনে যার যার সবচেয়ে ভাল পোশাক। হাতে খেলনা, জলের বোতল, বই, ডায়েরি।
মিছিল করে তারা চলল। সামনে তাদের ‘মাস্টারমশাই’। এক রাস্তার মোড় ঘুরল দলটা। তারপর হারিয়ে গেল চিরতরে…




