যেথা চিরনিদ্রায় হেয়ার সাহেব – সৌভিক রায়
ভারতে এসে সাহেবরা কেবল শাসক হয়ে বসে ছড়ি ঘোরাননি, বরং কেউ কেউ এদেশীয়দের শিক্ষিতও করেছেন। জেমস লং, জন বেথুন, আলেকজান্ডার ডাফ, হেনরি ডিরোজিওদের অবদান বঙ্গ সমাজে অনস্বীকার্য। তেমনই উনিশ শতকের বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ডেভিড হেয়ার। উনিশ শতকের পরাধীন বাংলায় শিক্ষার প্রদীপ জ্বেলেছিলেন হেয়ার সাহেব। কৃতজ্ঞ চিত্তে কলকাতবাসী তাঁর নামে একখানা স্কুল ও একটি রাস্তার নামকরণ করেছে।
ডেভিড হেয়ারের জন্ম ১৭৭৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। স্কটল্যান্ড থেকে এ দেশে এসেছিলেন বছর পঁচিশের হেয়ার সাহবে। আর ফিরে যাননি নিজভূমে। ভাগ্য অন্বেষণের হেতুতে কলকাতায় এসেছিলেন সাহেব। ঘড়ির ব্যবসা করে ভাগ্য ফিরেওছিল। প্রথমে কলকাতার লারকিন্স লেনে, পরে আড়পুলি লেনে ঘড়ির দোকান খোলেন হেয়ার। অল্প দিনে ব্যবসা জমে উঠেছিল। এই ব্যবসাই শিক্ষা-অনুরাগী হেয়ার সাহেবের জন্ম দিল। বিকিকিনি চালাতে চালাতে হেয়ার দেখলেন, দেশীয় ক্রেতারা ইংরেজি জানেন না। ক্রমে পিছিয়ে পড়ছেন তারা। কলকাতার মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার ব্রত নিলেন সাহেব।
একেবারে গোড়ার দিকে বাড়ির আশপাশের শিশুদের পড়ানোর উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা গেল। পরে ১৮১৭ সালের ২০ জানুয়ারি তৈরি হল হিন্দু কলেজ। পাশে পেলেন রাজা রামমোহন রায়কে। গড়ে তুললেন স্কুল-বুক সোসাইটি। ধীরে ধীরে তৈরি হল ক্যালক্যাটা স্কুল-সোসাইটি। ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় বই লেখা হতে শুরু হল। ঘড়ির ব্যবসা বিক্রি করে লক্ষাধিক টাকা পেলেন হেয়ার। স্কুল প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষাপ্রসারের কাজ চলতে শুরু করল গড়গড়িয়ে। পড়ুয়াদের ডেকে এনে পড়াতেন, সঙ্গতি না-থাকলে তাদের ফি মকুব করে দিতেন, বই-খাতা কিনে দিতেন, কেউ অসুস্থ হলে বিলিয়ে দিতেন ওষুধ, কার শরীর খারাপ হল, কেউ কুসঙ্গে পড়ল কি-না! যাবতীয় নজরদারি চালাতেন একা হাতে। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে ধনীদের দুয়ারেও পৌঁছেছেন। মেডিক্যাল কলেজের সেক্রেটারি হিসেবে প্রাপ্য বেতন ব্যয় করেছেন শিক্ষা প্রসারে। হয়ে পড়েছিলেন একেবারে রিক্ত, নিঃস্ব!
ঠনঠনিয়ায় বাংলা পাঠশালা এবং একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল গড়লেন। নাম রাখলেন আড়পুলি পাঠশালা। বছর পনেরোর মধ্যে সিমলা এবং পটলডাঙায় তৈরি হল আরও দু’টি স্কুল। ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। কলেজ স্ট্রিট এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে আছে তাঁর দান করা জমিতে। হেয়ার শিক্ষার ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করতেন, পাশাপাশি মনে করতেন শিক্ষাই পারে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব লাঘব করতে। ডেভিড হেয়ার লড়াই করে গিয়েছেন আমৃত্যু। প্রতিপক্ষ, একদিকে ব্রিটিশ সরকার, অন্যদিকে, তদানিন্তন হিন্দু সমাজপতিদের দল। খিস্টসমাজও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল তাঁর কাজে।
হেয়ার নিজ ধর্মের প্রতি উদাসীন ছিলেন। স্বজাতি অর্থাৎ সাহেবদের সঙ্গে মোটেই ভাব ছিল না তাঁর। কারণ তিনি হিন্দু, এদেশীয়দের জন্যে কাজ করতেন। সাহেবরা হেয়ারকে নিজেদের গোত্রে ফেলত না। হেয়ার সাহেব জীবৎকালে এ জিনিসকে পাত্তা না-দিলেও ডেভিড হেয়ারের মৃতদেহ সাহেবদের রোষে পড়েছিল। আর শুধু সাহেবরা কেন, হিন্দুরাও কম যায়নি সে সময়।
কলেরায় আক্রান্ত ছাত্র ভোলানাথের সেবা করতে ১৮৪২ সাল ৩১ মে কলেরার কবলে পড়লেন বছর সাতষট্টির ডেভিড হেয়ার। নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন সময় শেষ হয়ে আসছে। বেহারাকে দিয়ে নিজেই নিজের কফিনের ব্যবস্থা করলেন। পরদিন ১ জুন সন্ধ্যায় মারা গেলেন তিনি। গোটা কলকাতা ফেটে পড়ল, হেয়ার সাহেব চলে গিয়েছেন। কিন্তু খ্রিস্ট সমাজ ডেভিড হেয়ারের শবের জন্যে জমি দিতে রাজি নয়। সাহেবদের কবরখানায় জায়গা হল না হেয়ার সাহেবের। মুখে কলেরা ছোঁয়াচে রোগ এ-সব দোহাই দিলেও আসল কারণ ছিল ডেভিড হেয়ারের হিন্দুপ্রীতি। উপায় বের হল, জুনের দোসরায় সেকালের গোলদীঘির কাছে অর্থাৎ কলেজ স্কোয়ারেই চির ঘুমের জন্যে জায়গা পেলেন ডেভিড হেয়ার। আজকের বইপাড়া চত্বর সেদিন ভিড় দেখেছিল। শবযাত্রায় রাধাকান্ত দেব, বাবু প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রামতনু লাহিড়ীরা ছিলেন। আম জনতাও ছিল। ডেভিড হেয়ারের বউবাজারের বাড়ি থেকে মাধব দত্তের বাজার পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ এসেছিলেন। প্রসঙ্গত, মাধব দত্তের বাজারই কিন্তু আজকের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। জৈষ্ঠের ঝড়-জল মাথায় করে মানুষ বিদায় জানালেন সাহেবকে। কিন্তু সমাধি নিয়ে শুরু হল বিতর্ক।
হিন্দুরা রব তুললেন, মৃতদেহ সমাহিত করায় গোলদিঘির জল বিষিয়ে উঠেছে। পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হল। স্থানীয় বাসিন্দারা মামলা ঠুকলেন। তাদের দাবি, মৃতদেহ সমাধিস্থ করায় পুকুরের জল পানের অযোগ্য হয়ে গিয়েছে। ওই জল পান করা না-কি হিন্দুদের জন্যে শাস্ত্র বিরোধী। অতএব কবর সরিয়ে নিতে হবে। কোর্টে লড়াই হল। হেয়ার শিবিরের লোকেরাও নিজেদের বক্তব্য জানালেন। রায় বের হল, ডেভিড হেয়ার জিতলেন থুড়ি তাঁর কবর জিতল। তাছাড়া পুকুর থেকে অনেকটাই দূরে ছিল কবর, তাতে জল দূষণ হতেই পারে না। সেই কবর আজও কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যমান। কলেজ স্কোয়ারের দক্ষিণ পাড়ে পুকুরের ধারে হেয়ার সাহেবের কবর আর স্মৃতিসৌধ রয়েছে। ডেভিড হেয়ার অনুগামীরা এক টাকা করে চাঁদা দিয়ে স্মৃতিসৌধটি তৈরি করেছিলেন। ডেভিড হেয়ারের স্মরণিকা স্তম্ভে লেখা রয়েছে, ‘‘একটি বিখ্যাত নাম প্রাতঃস্মরণীয়,/ জনসেবা শিক্ষাদানে তিনি বরণীয়।/ অফিস পাড়ায় আছে পথ তাঁর নামে,/ লালদিঘি পড়ে যেথা বহু গাড়ি থামে।/ হেয়ার স্কুলের নাম সেই সরণিটির,/ সারাদিন লোকারণ্য চোখে পড়ে ভিড়।/ গোল দিঘির কাছে তাঁহার নামে স্কুল,/ মহান পুরুষ তিনি নেই কোন ভুল।/ গোল দিঘিতে স্তম্ভ স্মরণিক তাঁহার,/ প্রণাম জানাই তাঁরে শ্রদ্ধা বার বার।’’
স্কটিশ সাহেব শুধুমাত্র একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন না, ছিলেন সমাজ সংস্কারক। তিনি এমন একটা সময় এদেশে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিলেন, যখন ভারতীয় সমাজ ছিল বদ্ধ। গোঁড়ামি ছিল প্রতিটি বাঁকে, সেই সব কিছুকে ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুড়ে দিয়েছিলেন হেয়ার সাহেব।






